Friday, 22 June 2018

মেসিকে পিসির ফোন

                                            মেসিকে পিসির ফোন
গতকাল কোর কমিটির বৈঠক থেকেই কালীপিসি মটকা গরম হয়েছিল। আর বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ৩ গোলে হারার পর রাগ চরমে পৌঁছে যায়। রাতেই তড়িঘড়ি নবান্নে বৈঠক ডাকা হয়। ডাকা হয় সমস্ত নেতা, মন্ত্রী, আমলাদেরও। আর্জেন্টিনার টিমের অফিসিয়ালদের ওপর ভরসা না করেই সিআইডিকে দিয়ে এই হারের তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং সিট গঠন করার সিদ্ধান্ত নেন। এদিকে আনন্দবাবু বিশ্বকাপ কভার করতে রাশিয়া গেছে কিন্তু পিসির সাথে তার সম্পর্ক ইদানিং একটু এগিয়ে না থেকে পিছিয়ে রয়েছে তাই ফোন করে খোঁজ নিতেও পাচ্ছেন না! অগত্যা বাধ্য হয়েই নবান্ন থেকে পিসি সরাসরি ভিডিও কল করে মেসিকে ধমক দিলেন।
কি ব‍্যাপার! খেলায় তো দেখছি আদৌ মন নেই! তুমিও কি কাননের মতন কাউকে জুটিয়ে মাঠের বদলে খাটে কালবৈশাখী ঝড় তুলছো! আমার কতদিনের ইচ্ছা এবারে বিশ্বকাপ জিতলে ওনাকে নিয়ে আর্জেন্টিনা গিয়ে তোমাদের সংবর্ধনা দিতে যাবো! প্রত‍্যেককে আমার লেখা বই উপহার দেব! তাছাড়া ওনার এখনও আর্জেন্টিনা ভ্রমণ করা হয়নি, ২০১৯শের আগেই করতে হবে। পরে যদি সুযোগ না মেলে! আর তোমরা ব‍্যাপারটা মোটেই সিরিয়াসলি নিচ্ছোনা! কতবার বলেছি নীলসাদা জার্সি কেবল পরে খেললে হবেনা! সাথে হাওয়াই চটিও পরতে হবে। এ্যাই ববি, তুমি কালই ১০০জোড়া হাওয়াই চটি রাশিয়াতে পাঠানোর ব‍্যবস্থা করো। আমি তিন আঁচড়ে একটার পর একটা 'আন্তোরজাতিক' মানের ছবি আঁকছি আর তুমি তিন কাঠির মধ‍্যে বল রাখতে পারলেনা! ঠিক আছে চাপ নিও না, আমি ফিফার সাথে কথা বলছি, পরের ম‍্যাচ গুলোতে যেন রাগবির গোল পোস্ট লাগানোর ব‍্যবস্থা করে।
খেলার মধ‍্যে সেই ছন্দ আদৌ দেখতে পাচ্ছি না! ডিফেন্স খুব দুব্বল, অ্যাটাকও ঠিকমতো হচ্ছে না! সাম্পাওলিকে দিয়ে কিসস‍্যু হবেনা! আমি ভাইপোকে পাঠিয়ে দিচ্ছি, ও বেশকিছু টিপস দেবে। বিশ্বকাপে না খেললেও বিশ্ববাংলার বল নিয়ে খেলার অভিজ্ঞতা আছে দারুণ। তিন তিনটে গোল খেতে হলো! ডিফেন্স বলে তো কিছু নেই! আমি ভাইপোর সাথে কেষ্টাকেও পাঠাচ্ছি। কিভাবে উন্নয়নকে দাঁড় করিয়ে ডিফেন্স করতে হয় শিখিয়ে দেবে। 'ফরোয়াড' তো দূর, একটা মশাও গলতে দেবেনা! এমনকি রেফারি, লাইস ম‍্যানকেও ডিফেন্সের ধারেকাছে ঘেসতে দেবেনা।
গ্রুপের শেষ ম‍্যাচ নাইজেরিয়ার সাথে। যেভাবেই হোক জিততেই হবে। আমি অধিকারীকে বলে দিচ্ছি - এ্যাই অধিকারী, তুমি আজ রাতের ফ্লাইটে বেরিয়ে যাও। এই কদিনের মধ‍্যে নাইজেরিয়ার স্টাইকারদের ভয় দেখিয়ে দল বদল করিয়ে আর্জেন্টিনার দলে নিয়ে নাও! আর হ‍্যাঁ যাওয়া সময় ১০০ সিভিক ভলেন্টিয়ার নিয়ে যেও। ওরা খেলার সময় রাশিয়ার পুলিশের সাথে মাঠে ডিউটি করবে। আর সুযোগ পেলে বিরোধীদের গোলে বল ঢোকাতে সাহায্য করবে। ঠিক যেমন পঞ্চায়েত ভোটে করেছিল!
তবে এটা মাথায় রাখতে হবে, খেলা হচ্ছে রাশিয়ায়। হার্মাদের দেশে। এর পেছনে সিপেমের চক্কান্ত থাকলেও থাকতে পারে। তাই 'তাজা ছেলে' এঁড়েবুলকে বলেছি 'গুফ' লীগের শেষ ম‍্যাচের আগে ও বাইক বাহিনী নিয়ে রাশিয়ার পৌঁছে যাবে আর স্টেডিয়ামের বাইরে পাহারা দেবে। হঠাৎ পিছন থেকে কেউ বলল, বাইক নিয়ে বাংলা থেকে রাশিয়া! কালীপিসি দৃপ্ত কন্ঠে বলল, কেন পারবেনা! গৌতম বুদ্ধ যদি হেঁটে নেপাল থেকে জাপান যেতে পারে তাহলে বাইক বাহিনী কেন বাংলা থেকে রাশিয়া যেতে পারবেনা!
যে পরামর্শ গুলো দিলাম সেগুলো অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলো তবেই সাফল‍্য আসবে! যে পাবলিক তোমাকে আজ ভগবান ভাবে, ভুলে যেওনা তারাই ৩০০বছর পর আমার মন্দির করে পুজো করবে।
ও হ‍্যাঁ, আরেকটা কথা, নাইজেরিয়া সাথে খেলায় মাঠে নেমে সবাই একসাথে 'পাত্থোনা' করার পর আমার এই লেটেস্ট কবিতাটা সবাই মিলে একবার বলবে তাহলে দেখবে জয় আর কেউ আটকাতে পারবেনা!
ধরবো বল, কর্মফল, এগিয়ে চল,
'কন্নার' তোল, হবে গোল, হাল্লাবোল
অফসাইড, দারুণ ফাইট, ডে-নাইট
'ফি-কিক', চারিদিক, রেফারিক ধিক্
নেই ভয়, হবেই জয়, নিশ্চয়
(এটি কাল্পনিক রচনা। বাস্তবের সাথে কোনো মিল থাকলে কাকতালীয় )

Thursday, 15 February 2018

কৈলাশে ভ‍্যালেনটাইন

সকাল থেকেই পার্বতী আজ খুব কনফিউশনে আছে। বাবা ভোলেনাথকে গোলাপ দিয়ে আগে ভ‍্যালেনটাইন উইস করবে, নাকি মাথায় দুধ ঢেলে স্নান করাবে। তার ওপর ছেলেমেয়ে গুলো সকাল থেকেই একটার পর একটা আবদার করেই চলেছে। 

কার্তিক সাতসকালে মাঞ্জা দিয়ে ড্রেস করে এসে বলল, মা হাজার কুড়ি ক‍্যাশ দাও তো! এতো টাকা তুই কি করবি! আরে এবারে শিল্প সম্মেলনে গিয়ে একটা শিল্পপতির মেয়েকে পটিয়েছি তাই খরচা একটু বেশি। প্রথমে একটু খরচা হবে, তবে মেয়ে বলেছে ওর বাবা আমার ব‍্যবসায় বিনিয়োগ করবে। পার্বতী হাঁ করে ছেলের কথা শুনছিল। তারপর বলল, সে তো বুঝলাম, কিন্তু অতো টাকা তো এখন আমার কাছে নেই। কার্তিক এবারে আবদার করে বলল, পিসির ভোট প্রচারের জন‍্য মামা গতকাল যে এক কোটি তোমার কাছে দিয়ে গেছে, ওটা থেকেই নাহয় দাও। খবদ্দার কাতু, ঐ টাকার দিকে ভুলেও তাকাবিনা! জানিস তো তোর পিসি কেমন রাফ এন্ড টাফ! আবার গুন্ডা কন্ট্রোল করে! কার্তিক হতাশ হয়ে বলল, মা পিসির জন‍্য এবারও বিনিয়োগটা মনেহয় আটকে গেল!

সরস্বতী মন খারাপ করে বসে আছে দেখে পার্বতী কি ব‍্যাপার জিঞ্জেস করে জানতে পারলো ওর কাছে টাকা নেই। তাই ভ‍্যালেনটাইন-ডে তে ব্রম্মাকে সোনার চেন গিফ্ট করবে প্রমিস করেছিল। পার্বতী বলল, কেন তোর পিসি তো কন‍্যাশ্রীর টাকা দিয়েছে ওটা দিয়ে কিনে দে। সরস্বতী হেসে বলল, ঐ টাকায় কি হবে! ব্রম্ভার চারটে মাথা, চারটে চেন লাগবে। তাছাড়া নারদ কাকু পিসির দেওয়া কন‍্যাশ্রীর টাকা থেকে কমিশন খেয়েছে। পার্বতী সব শুনে বলল, এবছরটা জামাইকে বলে কয়ে ম‍্যানেজ করে নে। সরস্বতী মুখ বাঁকিয়ে বলল, তোমার জামাই পদ্মফুলে বসে থাকে, প্রচুর কালোধনের মালিক, অল্পতে মোটেই খুশি হবেনা। আহাঃ একটা বছরই তো! সামনে বছর তোর পিসি রূপশ্রীর টাকা দেবে তখন দেখবি আর সমস্যা হবে না।

এমন সময় গনেশ কাঁদতে কাঁদতে এলো। মা, মা, আমি আর তোমার বৌমা আজ একটু সেন্ট্রাল পার্কে বসে গল্প করছিলুম। হঠাৎ একদল ছেলে এসে আমাদের ক‍্যালাতে লাগলো। বলে কিনা পার্কে বসে গল্প করা যাবেনা। সত‍্যি করে বল, তোরা কি শুধুই গল্প করছিলিস? গনেশ মাথা নিচু ক‍রে বলল, একটা কিস খেয়েছি। তাবলে ওরা মারবে! আমি আমার বৌকে খেয়েছি, ওদের বৌকে তো খাইনগ। ওদের দলের মেইন পান্ডা পবন কাকুর ছেলে। 

এই প্রথম কোনো ভ‍্যালেনটাইনডে লক্ষীকে বিছানায় শুয়ে শুয়েই কাটাতে হচ্চে। আসলে নারায়ণ এখন দক্ষিণ লন্ডনে নতুন ফ্ল‍্যাট নিয়েছে। ওখানের কর্পোরেশনের জল খেয়েই বিপত্তি। বেচারির ডাইরিয়া হয়ে গেছে। 

ছেলেমেয়েদের সমস্ত ঝামেলা মিটিয়ে পার্বতী স্বামীর জন‍্য গোলাপ আর দুধ দুটো নিয়েই হাজির হলো। বাবা তখন ফুল আউট। পাঁচ ছ বার ডেকেও যখন সাড়া পেলো না তখন নন্দী ভিঙ্গীর দিকে কটমট করে তাকিয়ে বলল, কি কেস! এতো গাঁজা বা ভাং নয়! কি খাইয়েছিস! তখন নন্দী মিঙমিঙ করে বলল, আপনার বোনের বাড়ি থেকে যে বোতলগুলো সিআইডি উদ্ধার করেছিল সেগুলো ... ভিঙ্গীর দিকে তাকাতে সেও ভয়েভয়ে বলল, কয়েকটা গুজরাট ভোটে বেঁচে যাওয়া বোতলও ছিল ওর সাথে। আসলে বাবার দুরকম খেয়ে ককটেল হয়ে গেছে। পার্বতী ধমক দিয়ে বলল, যা তাড়াতাড়ি লেবু নিয়ে এসে খাওয়া। নন্দী বলল, নাগপুর থেকে আনবো? পার্বতী আরও রেগে বলল, পাতিলেবু লাগবে, কমলা নয়!

অবশেষে লেবু খাইয়ে নেশা কাটিয়ে বাবা উঠে বসলেন। তখন পার্বতী বাবাকে বলল, আমি সত‍্যিই কনফিউশনে, কোনটা তোমাকে আগে দেব! গোলাপ নাকি দুধ? মহাদেব তখন হেসে বললেন, ওরে পাগলী গোলাপের পাপড়িগুলো ছিড়ে ঐ দুধে ছড়িয়ে দে। তারপর ঐ পাপড়ি মেশানো দুধটা আমার মাথায় ঢেলে দে। তাহলেই তোর শিবরাত্রী আর ভ‍্যালেনটাইন, দুটোই একসাথে পালন করা হয়ে যাবে।

Thursday, 18 January 2018

রানীর অসুখ

রানীর ভারি অসুখ। সরকারি, বেসরকারি, সুপার স্পেশ‍্যালিটি, কোনো হাসপাতালের ডাক্তারই সারাতে পারলো না। অসুখটা যে কী তা কেউ বলতে পারে না, অসুখ সারাতেও পারে না। সারাবে কী করে? অসুখ তো আর সত্যিকারের নয়। রানীর কেবলই মনেহয়, আসেপাশের সবাই তার বিরুদ্ধে চক্কান্ত, ষড়যন্ত্র করছে। কত রকমের কত ওষুধ রানী খেয়ে দেখলেন, কিছুতেই কিছু হল না। আই ফোন কিনে দেওয়া হলো, হাওয়া বদলের জন‍্য সিঙ্গাপুর, লন্ডন, জার্মানি, নেদারল্যান্ডে ঘুরতে নিয়ে যাওয়া হলো, কিন্তু রানীর মানসিক অবস্থার কোনো উন্নতি হ'ল না।

তখন রানী'মা গেলেন ক্ষেপে। তিনি বললেন, "চাবকে লাল করে দাও এই অপদার্থগুলোকে, পেছনে বাঁশ দিয়ে দাও।" এমনি করে চিকিৎসকেরা বিদায় হলেন। এমনকি রানীর পছন্দের চিকিৎসক, কুকুরের ডায়ালিসিস স্পেশালিস্টও ভয়ে আর কেউ রানীর বাড়ির দিকেও যায় না। তখন সকলের ভাবনা হ'ল, তাই তো, শেষটায় কী রানী প‍্যানিকেই মারা যাবেন?

এমন সময় নাগপুর থেকে এক হাফ প‍্যান্ট পরা সন্ন্যাসী এসে বলল, "অসুখ সারাবার উপায় আমি জানি, কিন্তু সে ভারি শক্ত। তোমরা কী সব করতে পারবে?" মন্ত্রী, কোটাল, সেনাপতি, পাত্রমিত্র সবাই বলল— "কেন পারব না? খুব পারব।" রানীর প্রিয় দামালরা বলল, "জান্‌ দিতে হয় জান্‌ দেব!" তখন সন্ন্যাসী বলল, "প্রথমে এমন এক লোক খুঁজে আন যিনি গোমাতার ভক্ত, যিনি সারাক্ষণ বন্ধুদের (মিত্রোঁ) মনের কথা শোনান (মন কি বাত), যে দাঙ্গা হোক বা কৃষক আত্মহত্যা, সব সময়ে, সব অবস্থাতেই খুশি থাকে।" সবাই বলল, "তারপর?" সন্ন্যাসী বলল, "তারপর সেই লোকের হাতে বানানো চা যদি রানীকে খাওয়ানো যায়, তাহলেই সব অসুখ সেরে উঠবে।"

তাড়াতাড়ি রানী মার কাছে খবর গেল। তিনি শুনে বললেন, "আরে, এই সহজ উপায়টা থাকতে এতদিন সবাই মিলে করছিল কী? যাও, এখনি খোঁজ করে সেই চা-ওয়ালা লোকটার কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে এস। জয়, মামা-টিমা-নুষ এর জয়"

চারিদিকে লোক ছুটল, রাজ্যময় 'খোঁজ-খোঁজ' রব পড়ে গেল, অলিতে গলিতে পাড়ার মোড়ে হাইওয়ের পাশে সব জায়গায় রানীর কাতিলানা হাসি মুখের ছবি দিয়ে পোস্টার টাঙানো হলো, কিন্তু সে লোকের আর সন্ধান পাওয়া যায় না। যে যায় সেই ফিরে আসে আর বলে, " কই, তেমন লোকের তো দেখা পাওয়া গেল না!" সবার মুখে এই একই কথা। তখন মন্ত্রীমশাই রেগে বললেন, "এদের দিয়ে কী কোন কাজ হয়? এ মূর্খেরা খুঁজতেই জানে না।" এই বলে তিনি নিজেই বেরোলেন সে অজানা লোকের খোঁজ করতে।

বিহারে গিয়ে তিনি দেখলেন, এক বুড়ো লোক প্রচুর গরুদের চারা খাওয়াচ্ছেন। মন্ত্রী ভাবলেন বাঃ এই লোকটাকে তো বেশ হাসি-খুশি দেখাচ্ছে, ওর তো অনেক ছেলেপুলে, টাকা পয়সাও আছে দেখছি। তাছাড়া এতো গরুকে ভালোবাসে। এর হাতের চা খেলেই রানী নিশ্চয়ই সুস্থ হয়ে উঠবেন। মন্ত্রীমশাই এর রকম ভাবছেন, ঠিক এই সময়েই পুলিশ এসে তাকে জেলে ধরে নিয়ে গেল। আশপাশের লোকজনদের জিঞ্জেস করে জানা গেল, লোকটা গরুদের খাবার নাকি নিজেই খেয়ে নিয়েছে। ব্যাপার দেখে মন্ত্রীমশাই মাথা নেড়ে সেখান থেকে সরে পড়লেন।

তারপর তিনি খোঁজ করতে দিল্লি চলে গেলেন। সেখানে গিয়ে রামলীলা ময়দানে দেখলেন এক বৃদ্ধ লোক শুয়ে আছে আর তাকে ঘিরে প্রচুর লোক জড়ো হয়েছে। কাছে গিয়ে তিনি জানলেন বৃদ্ধটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়তে অনশন করছেন। বৃদ্ধকে সমস্ত কথা খুলে বললেন মন্ত্রী। বৃদ্ধ বললেন, আমি তো অতো দূর যাওয়ার ধকল সইতে পারবো না! মন্ত্রী ভাবলো এতো আরেক সমস্যা, জোর করে নিয়ে গেলে যদি পথেই পটল তোলে! রানীকে খবর দেওয়া হলো। সব শুনে রানী নিজেই দ‍্যাখা করতে দিল্লি রওনা দিলেন। অবাক কান্ড, রানী দিল্লি পৌঁছে রামলীলা ময়দানে বসে আছে কিন্তু সেই বৃদ্ধর আর কোনো পাত্তা নেই! রানী বেজায় চটে গেছেন।

কিছুদিন পরে আবার রামলীলা ময়দানে ভিড় জমেছে দেখে মন্ত্রী ভাবলেন বৃদ্ধ বুঝি ফিরে এসেছে। অনেক আশা নিয়ে গিয়ে দেখলেন, সেই বৃদ্ধ নয়, এক অন‍্য গেরুয়া পোশাক পরা সাধু নাচানাচি করছে ওখানে। লোকটার মাথাভরা চুল, মুখভরা দাড়ি, সমস্ত শরীর পেঁচিয়ে ঠিক অস্কার পুরষ্কারের ট্রফির মতন অবস্থায় দাঁড়িয়ে পড়ছেন মাঝেমধ্যেই। তার সামনে রাখা আছে চাল ডাল সাবান শ‍্যাম্পু থেকে নুডুলস। মন্ত্রী দেখে প্রথমে ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। ইনি কি সাধু! নাকি মুদি দোকানদার! মন্ত্রী সেই বাবাকে সব কথা খুলে বলল। সব শুনে বাবা বললো, আমার পরিচিত এমন এক লোক আছে, তবে তাকে পাওয়া মুসকিল। আসলে তিনি কখন কোন দেশে থাকে বোঝা মুসকিল! আমি বাড়ির ঠিকানা দিয়ে দিচ্ছি। মন্ত্রী ঠিকানা নিয়ে প্রনাম করে উঠতে যাবে তখন বাবা তাকে তার বেশকিছু প্রোডাক্ট প‍্যাকেট দিয়ে বলল, এগুলো রানীর জন‍্য, একেবারে স্বদেশী।

দিন যায়, সপ্তাহ যায়, মাস যায়, মন্ত্রী সেই বাড়ির বাইরে অপেক্ষা করতে থাকে। কানাঘুষো শুনতে পায় লোকটা নাকি সার্জিক্যাল স্টাইক করে বিদেশে পালিয়েছে। অবশেষে ছমাস পর দেখা মিলল। ছাপান্ন ইন্চি ছাতি, গায়ে ১০লাখ টাকার কোট, মুখে রানীর মতন শিশুসুলভ হাসি। মন্ত্রী বিনয়ের সাথে তাকে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি যোদ্ধা? তিনি হেসে বলেন, আমি চৌকিদার। মন্ত্রী তারপর রানীর অসুখের কথা তাকে বলতে তিনি বললেন, আমি থাকতে রানীর কোনো ভয় নেই। এই নিন দুটো লাড্ডু, এদুটো রানীর দুহাতে দিয়ে দেবেন। আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রানীকে নিয়ে আমার বাড়িতে চলে আসুন। দেরি করবেন না, আমাকে আবার জন্মদিনের কেক কাটতে বিদেশে চলে যেতে হবে।

রানীকে সব কথা খুলে বলতে, রানী তার বাড়িতে চা খেতে যেতে রাজি হয়ে গেল। যদিও প্রথমে একটু ইতস্তত করছিলেন। তারপর দুজনে একান্তে বন্ধ ঘরে চা খেতে খেতে কথা শুরু করলেন। ঘন্টা তিনেক পর যখন দুজনে ঘর থেকে বার হলেন, তখন দুজনের মুখেই হাসি। একজন 'বিকাশ' বলে চিৎকার করছেন তো অন‍্যজন 'উন্নয়ন' বলে চিৎকার করছেন। মন্ত্রী পারিষদ হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। রানীকে এতো খুশি আগে কোনোদিন কেউ দেখেনি। শেষে রানীর সাথে উনি একটা সেলফি তুলে টুইট করলেনে। রানী ফেরার পথে সেটা রিটুইট করতে ভুললেন না।

(পুরোটাই কাল্পনিক গল্প)

Friday, 12 January 2018

পাগলা দাশু

আজ অভিকে হাসিমুখে লাফিয়ে লাফিয়ে স্কুলে ঢুকতে দেখে সবাই অবাক! কেষ্টা, নবিনচাঁদ ছুট্টে গেলো অভির কাছে। কেষ্টা জিঞ্জেস করলো, ভাই আজ এতো খুশির রহস্যটা কি? নবিনচাঁদ জিজ্ঞেস করলো, বিশ্ব বাংলার বলটা পিসি কি তোকে দিয়ে দিলো নাকি! অভি কেবল হাসতে লাগলো। দাশু একমনে বেঞ্চিতে ঘসে ঘসে কি একটা লিখছিলো। জগবন্ধু এসে দাশুকে বললো, ব‍্যাপারটা কিরে দাশু, অভি এতো লাফালাফি করছে কেন? দাশু বললো, অ্যাক্সিডেন্টের পর থেকেই ওর মাথাটা গেছে। মাঝেমধ্যেই গরম হয়ে যায়, তখন এমন লাফালাফি করে। জগবন্ধু বললো, তবে যে ডাক্তার বললো অভি পুরো সুস্থ। দাশু হেসে বলল, ওরম মনে হয়!

অভি ক্লাসে ঢুকতেই জগবন্ধু অভির মাথায় একমগ জল ঢেলে দিলো। শীতেকালে এমনিতেই অভি সপ্তাহে একদিন স্নান করে। তাও গরম জলে। নেহাত তখন পাশে কেষ্টা আর নবিনচাঁদ ছিল, নাহলে জগবন্ধুর জগত ছাড়া হওয়া থেকে কেউ আটকাতে পারতো না। দুজনে মিলে অভিকে জাপটে ধরে রাখে। অভি চেঁচাতে থাকে, হারামজাদাটাকে আজ মেরেই ফেলবো! জগবন্ধু কাঁচুমাচু হয়ে বলতে লাগলো, দাশুই তো আমাকে বললো অভির মাথা মাঝেমধ্যে গরম হয়ে যায়! তাই আমি...। মিনিট দশেক বাদে অভি শান্ত হতে কেষ্টা জিঞ্জেস করলো, কি গুরু কেসটা কি বললে না তো! অভি বুক ফুলিয়ে বললো, আজ আমার পিসি ডক্টর হয়ে গেলো! নবিনচাঁদ উত্তেজিত হয়ে বললো করলো, নিশ্চয়ই হার্ট স্পেশালিস্ট! অভি ঘাড় নেড়ে না বললো। জগবন্ধু বললো, তাহলে ডেন্টিস্ট। পাড়ার মোড়ে পিসির ইয়া বড়ো দাঁত বার করা ছবি টাঙিয়েছে দেখেছি। কেষ্টা জগবন্ধুর দিকে কটমট করে তাকাতেই জগা চুপ হয়ে গেল। শেষে অভিই বলল, আরে এটা ঐ ডাক্তার নয় ডক্টরেট উপাধি দেওয়া হয়েছে। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পিসির 'পোতিভার' সম্মান জানিয়ে এটা দিয়েছে। দাশু এতক্ষণ ওদের কথা শুনছিল, এবারে সে ফোড়ন কাটলো, তা পিসি কবে ইস্ট জর্জিয়ার উপাধিটা রিটার্ন করলো? অভি দাশুর কথার উত্তর না দিয়েই পিসির গুণকীর্তন করতে লাগলো। পিসি সমাজ সেবা করে, গান করে, কবিতা লেখে। দাশু আবার বলল, এপাং ওপাং ঝপাং। অভি উপেক্ষা করে বলেই চললো, পিসি পাহাড় জঙ্গল নিয়ে লেখা বই, গীতাঞ্জলি কথাঞ্জলী নানান বই আছে, পিসি দারুণ ছবিও আঁকে। দাশু আবার ফোড়ন কাটলো, এখন আর আঁকে না, খরিদ্দার এখন জেলে। এবারে অভির ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলো। রেগে গিয়ে অভি দাশুকে বলতে লাগলো, আমার পিসির পিছনে লাগলে তোমার পিছনে অ্যাটম বোমা ফাটিয়ে দেব। এটা শুনেই নবিনচাঁদ বলল, তোর পিসির অ্যাটমবোমা বিষ্ফোরণের ছবিটা দারুণ।

এমন সময় প্রধানশিক্ষক বিষ্টুবাবু ক্লাসে প্রবেশ করলেন। ঝগড়া বন্ধ করে যে যার জায়গায় চুপচাপ বসে পড়লো। তোমাদের জন‍্য একটা সুখবর আছে। এবার থেকে প্রতিবছর যারা পরীক্ষায় প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় হবে তাদের স্কলারশিপ দেওয়ার হবে। জগবন্ধু, স‍্যারের প্রিয় ছাত্র। তাই দিকে তাকিয়ে বিষ্টুবাবু বললেন, জগবন্ধু মেডেল হাতছাড়া করলে চলবে না! কেষ্টা বললো, স‍্যার হঠাৎ করে এই স্কলারশিপ কি উপলক্ষে চালু হলো? বিষ্টুবাবু বললেন, আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষামন্ত্রীর স্ত্রী গত হয়েছেন, তাই তার স্মরণে এটা উনি চালু করলেন। জগবন্ধু হাতের গাঁট গুনছে দেখে বিষ্টুবাবু জিঞ্জেস করলেন, কি হিসাব করছো? জগবন্ধু আফসোসের সুরে বলল, তিনটে বছর প্রথম হওয়া বৃথা হয়ে গেলো! যদি বছর খানেক আগে এটা চালু হতো...। বিষ্টুবাবু জিভ কেটে বললেন, ছিঃ ছিঃ অমন বলতে নেই! পিছনের বেঞ্চে বসে কেষ্টা আর দাশু ফিসফিস করে কথা বলছিল। বিষ্টুবাবুর চোখ যেতেই উনি কেষ্টাকে জিজ্ঞেস করলেন, কি আলোচনা চলছে শুনি! তোমাদের তো এ জন্মেআর স্কলারশিপ পাওয়ার আশা দেখছি না! কেষ্ট বলল, স‍্যার খাদ‍্যমন্ত্রীর স্ত্রী মারা গেলে কি স্মৃতির উদ্দেশ্যে এক প‍্যাকেট করে মিহিদানার প‍্যাকেট দেওয়া হবে? বিষ্টুবাবুর বেতের লাঠি কেষ্টার পিঠে পড়তেই কেষ্টা কাঁদতে কাঁদতে বলল, স‍্যার দাশু আমাকে বলেছে।

বিষ্টুবাবু ক্লাস থেকে বের হতে যাবেন এমন সময় নবিনচাঁদ বলল, স‍্যার আগামীকাল কি স্কুল ছুটি থাকবে? বিষ্টুবাবু রেগে গিয়ে বললেন, কোন দুঃখে! পড়াশোনার নাম নেই, কেবল ছুটি! নবিনচাঁদ ধমক খেয়ে কাঁচুমাচু হয়ে বলল, না মানে দাশু বলছিল অভির পিসি ডক্টর হয়েছে সেইজন‍্য আগামীকাল স্কুল অফিস কাছারি সব ছুটি থাকবে। স‍্যার যখন নবিনচাঁদকে ধমকাচ্ছিল তখন দাশু পিছনের বেঞ্চে বসে মিচকে মিচকে হাসছিল।

আচ্ছা, দাশু কি সত্যি সত্যি পাগল, না কেবল মিচ্‌‌কেমি করে ?

Monday, 11 December 2017

চারমূর্তি

শীত পড়তেই এবছর কোথায় পিকনিক করতে যাওয়া হবে সেই নিয়ে জোর ঝামেলা হাবুল আর প‍্যালার মধ‍্যে। হাবুলের ইচ্ছা বোলপুরে তাই হাবুল বলল, বোলপুর হলো 'কবিগুড়ি'র দ‍্যাশ। ছাতিম গাছের তলে বইস‍্যা কচি পাঁঠার ঝোল আর ভাত, ভাবলেই জিভে জল চইলা আ্যাইসে। তাছাড়া আমাগো মামা হইচে বীরভূমের ডিএসপি, সবাই তাকে দেইখ‍্যা সমীহ কইর‍্যা চলে। প‍্যালা এই শুনে বলল, থাক হাবুল, কেষ্টার হুমকি শুনে তোর মামার যে প‍্যান্ট ভিজে গিয়েছিল সেটা আমরা সবাই দেখেছি। তারচেয়ে বরং কোলকাতার কাছাকাছি নিউটাউন রাজারহাটের আশেপাশে কোথাও একটা করলে হয়। হাবুল বলল, আর জায়গা পেলিনা, মাংসের ঝোল কড়ায় ফুটবে আর হঠাৎ বিশ্ব বাংলার বল গড়িয়ে এসে সব উল্টেপাল্টে দিক আরকি!

এমন সময় ক‍্যাবলা বলল, ঐ তো টেনিদা আসছে। প‍্যালা পিছনের দিকে একবার তাকিয়েই তাড়াতাড়ি চানাচুরের ঠোঙাটা উল্টে পুরোটা গালের মধ‍্যে ঢেলে দিলো। টেনিদা এসে মাথায় চাঁটি মারতেই প‍্যালার মুখ দিয়ে চানাচুর বেরিয়ে পড়লো। টেনি মুখুজ‍্যেকে ফাঁকি দেওয়া অতো সহজ নয়! যা এখুনি আমার জন‍্য ঝালমুড়ি নিয়ে আয়। অগত্যা প‍্যালা ঝালমুড়ি আনতে চলল। টেনিদা তারপর হাবুল আর প‍্যালার সব যুক্তি শুনে বলল, পিকনিক করতে হয় এমন এক জায়গায় যেখানে পাড়াহ থাকবে, সমুদ্র থাকবে, ঘন জঙ্গল থাকবে, তা নাহলে অ্যাডভেঞ্চার হয় নাকি! হাবুল বলল, এতো ডেলো, মন্দারমনি আর জঙ্গলমহলের ককটেল, এমন জায়গা বাংলায় কোথাও আছে বলে শুনিনি! ক‍্যাবলা এতক্ষণ সব শুনছিল, এবারে সে বলল, আচ্ছা টেনিদা পিকনিকটা লিলুয়ায় করলে কেমন হয়? টেনিদা গাঁট্টা মেরে বলল, বাংলা, বিশ্ব বাংলায় পরিনত হয়ে গেল আর তুই এখনও লিলুয়ার মায়া ছাড়তে পারলি না!

এমন সময় প‍্যালা বলল, আজকে হাবুলের পিসি ডি-লিট পাওয়ার খুশিতে খাওয়াবে বলেছিল না? টেনিদা প‍্যালার মাথায় একটা জোরে গাঁট্টা মেরে বলল, হতচ্ছাড়া এতক্ষনে মনে পড়লো! আমি তাই এসে থেকে ভাবছি আজ কোথায় যেন একটা খাওয়া আছে। চল তাড়াতাড়ি চল, খিদেটা হঠাৎ আবার বেড়ে গেল। হাবুল বলল, কিন্তু আমাদের পিকনিক কোথায় হবে সেটা তো ঠিক হলো না! টেনিদা এবার রেগে গিয়ে বলল, মেফিস্টোফিলিসের মতন কথা বলিস না হাবুল, খালি পেটে হাজার চেষ্টা করলেও আমার পিকনিকের স্পটের নাম মনে পড়বে না।

হাবুলের বাড়িতে চারমূর্তি হাজির হতেই পিসি গরম গরম আলুরচপ আর বেগুনি খেতে দিলো। যথারীতি টেনিদা বাকিদের একটা করে দিয়ে নিজে সবটাই উদরস্ত করলো। তারপর জল খেয়ে একটা ঢেকুর তুলে বলল, কে বলে বাংলার শিল্পের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল নয়! পিসি হেসে বলল, তোমরা একটু বোসো আমি বাকি খাবারের জোগাড় একটু সেরে নিই! হাবুল বাকিদের নিয়ে তখন পিসির স্টাডিরুম ঘুরিয়ে দেখাতে লাগলো। দেওয়ালে সব পিসির আঁকা ঐতিহাসিক ছবি। হঠাৎ ক‍্যাবলা বলল, এই হাবুল সেই অ্যাটম বোম বিষ্ফোরণের ছবিটা দেখছি না! হাবুল বলল, ওটা কদিন আগে পিসি রাষ্ট্রপতিকে উপহার দিয়েছে। প‍্যালা টেবিল থেকে একটা বই হাতে নিয়ে পড়তে লাগলো, 'এপাং ওপাং ঝপাং'। এটা শুনেই টেনিদা বলল, এদিকে খিদেতে আমার পেট চুঁই চুঁই করছে আর তোরা হরলিক্সের আ্যাড শোনাচ্ছিস! প‍্যালা বলল, আরে এটা অ্যাড নয়, এটা পিসির লেখা কবিতা!

এমন সময় পিসির ঢাক শুনে সবাই ছুটে গিয়ে রান্নাঘরে হাজির হলো। মাজ, মাংস, মিস্টি, এলাহি ব‍্যাপার। প‍্যালা দেখে বলল, এতো 'আহারে বাংলার' স্টল! টেনিদা রেগে গিয়ে বলল, প‍্যালা, তুই একদম বেশি খাবিনা। ব‍্যাটা পিলে রুগী, কাঁচা জল খেলে অম্বল হয়। তারপর টেনিদা নিজেই যথারীতি সিংহভাগ খাবার সাবাড় করে দিলো। এতে বাকিদের যথারীতি খুব রাগ হলো। তাই খাবার শেষে পিসি টেনিদাকে মিস্টি করে ধমক দিয়ে বলল, টেনি ম‍্যাক্সিমাম খেও না, মিনিমাম খাও। টেনিদা হেঁসে বলল, জিআই তকমা পাওয়ার পর নবীন ময়রার রসগোল্লার স্বাদ দ্বিগুণ ভালো হয়ে গেছে।
(পুরোটাই কাল্পনিক গল্প, বাস্তবের সাথে মিল থাকলে কাকতলীয়)

Wednesday, 15 November 2017

রসগোল্লা রহস্য

আজ রবিবার, তোপসের টিউশন পড়তে যাওয়া নেই। তাই বিকালবেলা সোফায় শুয়ে শুয়ে ইনস্টাগ্রামে সদ‍্য শুরু হওয়া ফ্লিম ফেস্টিভ্যালের ছবি দেখছে। শাহরুখ আর পিসির ছবি দেখে তার হঠাৎ 'করন অর্জুন' সিনেমার কথা মনে পড়ে গেল। ব‍্যাকগ্রাউন্ডে মনে হলো গান বাজছে, বন্ধন ইয়ে, প‍্যার কা বন্ধন হ‍্যায়। তোপসের চোখে অটমেটিক জল এসে গেলো। তোপসে দেখল পাশে বসে ফেলুদা তখন টিভিতে খবর দেখছে, কেষ্টা প্রকাশ‍্যে হুমকি দিচ্ছে। এমন হুমকি তো মাফিয়া গুন্ডারা দেয়, তোপসের মুখে এই কথা শুনে ফেলুদা বলল, সাধে কি আর উনি বলেছেন, আমি গুন্ডা কন্ট্রোল করি।

এমন সময় কলিং বেজ বেজে উঠলো। দরজা খুলতেই লালমোহন বাবু রেগেমেগে হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করলো। তারপর সোফাতে ধপাস করে বসে বলল, হরেন্ডাস ব‍্যাপার মশাই! কি ব‍্যাপার ফেলুদা জিঞ্জেস করাতে লালমোহন বাবু বললেন, দিব‍্যি আপনার বাড়িতে আসছিলাম। নিউ টাউনের সিগন‍্যালে দাঁড়িয়ে আছি হঠাৎ গাড়ির পিছনে জোর ধাক্কা। প্রথমে ভেবেছিলাম কোনো গাড়ি এসে ঠুকলো বুঝি! কিন্তু নেমে দেখি হরেন্ডাস ব‍্যাপার, গাড়ি না! আমাদের গরমেন্টের তৈরি বিশ্ব বাংলার বল। ব‍্যাক লাইটটা ভেঙে গুড়ো হয়ে গেলো! ফেলুদা মুচকি হেসে বললেন, ওটা ভাইপোর বল। তোপসে অবাক হয়ে বলল, ওটা তো সরকারি বল! ফেলুদা বলল, বল গড়াগড়ি খাওয়ার আগে পর্যন্ত সবাই সেটাই জানতো।

লালমোহন বাবু ফেলুদাকে বলল, তা এবারে শীতে কোথায় যাওয়া হবে ঠিক করলেন কিছু? ফেলুদা একটা চারমিনার ধরিয়ে দুটো রিঙ ছেড়ে বললেন, গ‍্যাং বা ড‍্যাং তো যাওয়া যাবেনা! পাহাড় খুব জোর হাসছে। লালমোহন বাবু উত্তেজিত হয়ে বললেন, তাহলে রাজস্থানেই যাওয়া হোক। সেই কবে সোনারকেল্লা দেখেছিলাম, আপনার মনে আছে? ফেলুদা ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো। লালমোহন বাবু বললেন, ছোট্টো ছেলে মুকুলটা তো ভয়ে আমার কোলের ভিতর ঢুকে পড়েছিল। আচ্ছা মিত্তির মশাই, মুকুল অনেক বড়ো হয়ে গেছে না! এখনও কি ভয় পায়? ফেলুদা চারমিনারে আরেকটা টান দিয়ে বলল, হ‍্যাঁ ভয় পায়। তবে সিবিআইয়ের, তাইতো সে এখন পদ্ম বনে লুকায়। লালমোহন বাবু ফেলুদার কথার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে না পেরে তোপসের মুখের দিকে তাকায়। তারপর ফেলুদাকে উদ‍্যেশ‍্য করে বলেন, মুকুল সম্বন্ধে আরেকটি প্রশ্ন করতে পারি? ফেলুদা ঘাড় নাড়তে লালমোহন বাবু বললেন, মুকুল কি কাঁটা বেছে পদ্ম বনে ঢুকেছে?

ফেলুদা চারমিনারের শেষটা অ্যাসট্রেতে গুঁজে লালমোহন বাবুকে বললেন, রহস্য উপন্যাসের জন‍্য রাজস্থানে না গিয়ে দেগঙ্গা বা ভাঙড়ে যেতে পারেন। প্রতিদিনই মার্ডার হচ্ছে, সবাই জানে খুনি কে, কিন্তু কেউ মুখ খুলছে না। লালমোহন বাবু অবাক হয়ে, বলেন কি মশাই! কেন কেউ মুখ খুলছে না? ফেলুদা হেসে বলেন, ওটাই তো রহস্য। তোপসে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল, তুমি কি ডেঙ্গুর কথা বলছো! ফেলুদা তোপসের পিঠ চাপড়ে বলে, সাবাস! আস্তে আস্তে তুই আমার অ্যাসিসেন্ট হওয়ার যোগ‍্য হচ্ছিস। লালমোহন বাবু অবাক হয়ে বলেন, ডেঙ্গু তো বাংলায় নেই! ওরা তো ভিনদেশী। ফেলুদা লালমোহন বাবুকে বলল, বুঝলেন গাঙ্গুলী বাবু ডেঙ্গু নিয়ে লিখলে একটা সমস‍্যা আছে। উপন্যাস আপনি প্রকাশ করতে পারবেন না। তার চেয়ে বরং আপনি রসগোল্লা নিয়ে একটা উপন্যাস লিখুন। সদ‍্য ওড়িশা থেকে যুদ্ধ জয় করে ফিরেছে। মার্কেটে ভালো খাচ্ছে সবাই। দুদিনেই জুকেরবার্গের সুগার ৪০০ ছাড়িয়ে গেছে। লালমোহন বাবু হেসে বললেন, এটা দারুণ বলেছেন। তাছাড়া রসগোল্লার ওপর আমার দুর্বলতা রয়েছে অনেকদিন থেকেই। কিন্তু উপন্যাসের নাম কি দেব? লালমোহন বাবু মাথা চুলকাতে লাগলেন।

বাড়ি ফেরার সময় গাড়ির দরজা খুলতে গিয়ে হঠাৎ চিৎকার করে বলে উঠলেন, পেয়েছি! পেয়েছি! তারপর গদগদ মুখে ফেলুদার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার পরবর্তী উপন্যাসের নাম 'রসগোল্লা রহস্য'। ফেলুদা প্রত‍্যুতরে হেসে বললেন, এবারে আপনার ডি-লিট পাওয়া আর কেউ আটকাতে পারবে না...

Thursday, 19 October 2017

ভূত চতুর্দশীর গল্প

ভূত চতুর্দশীর রাতে কালীঘাট শশ্মানে বেশকিছু বিখ‍্যাত ভূত জমায়েত হয়েছেন। সবাই মিলে রবি'দাকে, মানে রবি ঠাকুরকে সভার সভাপতি নির্বাচিত করেছেন। সভাপতির চেয়ারে বসে...

রবি ঠাকুর - যাক ছ-বছর ট্রাফিক সিগন‍্যালে ঝোলার পর আজ অন্তত একটু বসতে পারলুম। যা দিনকাল পড়েছে এখন তো রাস্তাঘাটে বেরোতে ভয় লাগে। সেদিন এসবিআই ব‍্যাঙ্কে গিয়েছিলাম একটা দরকারে। ক‍্যাশ কাউন্টারের নতুন ছোকরাটা আমাকে চিনতেই পারলো না! যখন বললাম, আমি রবীন্দ্রনাথ তখন গম্ভীরভাবে বলল, ওহ আপনিই আমাদের কোচবিহারের এক স্টাফকে শুয়োরের বাচ্চা বলেছিলেন তাই না! অবস্থা বেগতিক দেখে আমি সেখান থেকে কেটে পড়লুম।

সিরাজউদ্দৌলা - যাই বলেন, পরিবর্তনের থেকে ব্রিটিশ পিরিয়ড অনেক বেটার ছিল। ওদের বড়লাটকে খাজনা দিলেই মিটে যেত। এখন তো কচিনেতা, বড়নেতা, মিনিমাম ম‍্যাক্সিমাম হাজার ঝামেলা। নীলকর সাহেরাও এদের তোলাবাজী সিন্ডিকেট দেখে লজ্জা পেত।

নেতাজি - হ‍্যাঁ, যাস্ট ভাবা যাচ্ছে না! আমার বাড়ি মেরামতি হবে সেখানেও সিন্ডিকেট ঢুকে পড়েছে! আমার পাত্তা দিস না ঠিক আছে, নাতি তো তোদের দলই করে। তার মুখ চেয়ে অন্তত ছাড় দিতে পারতো!

চিত্তরঞ্জন- তুই একবার ভেবে দেখ সুভাষ, আমরা যে ঘরে বসে কর্পোরেশন চালিয়ে ছিলাম, সেই ঘরে সিবিআই ঘুষখোরটা কিভাবে ঘুষ নিয়েছে সেটার তদন্ত করার জন‍্য যাচ্ছে।

নজরুল - আমিই বৃথাই লিখেছিলাম, কারার ই লৌহ কপাট, ভেঙে ফ‍্যাল... ব্রিটিশ পিরিয়ডে উনি থাকলে, কারাগার ভাঙার কোনো দরকারই পড়তো না। উনি থানায় গিয়ে ভাঙচুর করে, চমকিয়ে ধমকিয়ে ছাড়িয়ে আনতেন।

সত‍্যেন্দ্রনাথ দত্ত - 'আজব ছড়া' বইটা পড়ার পর বুঝেছি, কবিতার ছন্দ কিভাবে মেলাতে হয়।

অবনীন্দ্রনাথ - আমি এখনও ভেবে উঠতে পারিনি ঐ ছবিটার দাম কিরে ১কোটি ৮৬লক্ষ হলো! তবে কন‍্যাশ্রী পুরষ্কার নেওয়ার সময় ও যে ছবিটা উপহার দিয়েছিল, সেটা যে ব‍্যাঙের পৌস্টিকতন্ত্রের সেটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল।

বিদ‍্যাসাগর - জালি সার্টিফিকেটধারীদের নিয়ে কি আর বলবো! তবে ওদের সবার উচিত একবার করে বর্ণপরিচয় পড়া। ফ্লেক্সে যা বানান ভুল করে!

শ‍্যামা প্রসাদ - উনি কেবল উন্নয়নের জোয়ার আনেননি, উনি এ রাজ‍্যে আরএসএসের জোয়ারও এনেছেন। দাঙ্গা দাঙ্গা খেলায় উনি আমাদের মতন সমান পারদর্শী। আর হবে নাই বা কেন, উনি যে সাক্ষাৎ 'দুর্গা'।

রামকৃষ্ণ - আমার স্ত্রী'র ওপর থেকে আমার বিশ্বাস উনিই তুলে দিয়েছেন। আমার নয়, ওনার অনুপ্রেরণায় প্রোমোটাররা মানুষের মধ্যে 'টাকা মাটি মাটি টাকা' এই বানী বেশ ভাল ছড়িয়েছে।

বিবেকানন্দ - ওনার বড়দা তো আমার শিকাগো বক্তৃতার পাঞ্চ লাইনটা, 'আমার প্রিয় ভাই ও বোনেরা' ঝেপে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেলো। ঐ ভাষনের শুরুতেই বলে তো, মেরে প‍্যায়ারে ভাইয়ো ওউর ব‍্যাহেনো...

সত‍্যজিৎ - ওনার কৃপায় আমি মারা গিয়েও কিন্তু এখনও'ধরনী'তেই আছি। বেঁচে থাকলে ফেলুদা সিরিজে আর কয়েটা অ্যাড করতে পারতুম। এই যেমন ডেলোতে কেলো, পাতলেবাস সরগরম, জঙ্গলের হাসির রহস্য। তবে মুকুলের জন‍্য আজ খুব কষ্ট হয়। বেচারা আজও দুষ্টু লোক চিনতে শিখলো না।

সত‍্যেন্দ্রনাথ বসু - আমি শুধু ভাবি, ব‍্যাটা কেষ্টা, কেমিস্ট্রির ক জানেনা। কিন্তু বোমার মশলার মাপ কি করে এত নিখুঁত করে!

রামমোহন - আমি কোন বিধানসভা থেকে ভোটে জিতে এমএলএ হয়েছিলাম সেটা আজও খুঁজছি।

জগদীশ চন্দ্র - আমি গাছের প্রাণ আছে বলেছিলাম। আর এরা তাতেই বার খেয়ে সিঙ্গুরের কংক্রিটের জমিতে সর্সে চাষ করলো! এবারও ভেবে দেখলনা গাছ গুলো বাঁচবে কি করে!

ভূত চতুর্দশীর সভা বেশ ভালোই চলছিলো। হঠাৎ একটা বাচ্চা ছেলে আর একটা বাচ্চা মেয়ে খেলতে খেলতে সেখানে চলে আসে। এতরাতে দুটো বাচ্চাকে শ্মশানে খেলতে দেখে সবাই হকচকিয়ে যায়। তারা কোথা থেকে এখানে কিভাবে এসেছে তা জিঞ্জেস করাতে। বাচ্চা ছেলেটি জানালো, দিন চারেক আগে তাদের দুই ভাইবোনের একসাথে ডেঙ্গু হয়। শুনে বাকিরা সবাই চুপ হয়ে যায়। কেবল একে অপরের মুখের দিকে দেখতে থাকে। তখন তার ছোট বোনটি বলল, না না আমাদের ডেঙ্গু হয়নি। আমরা অজনা জ্বরে মারা গিয়েছি।

(কাল্পনিক গল্প, বাস্তবের সাথে কোনো মিল নেই)