Wednesday, 24 August 2016

কাল্পনিক বক্তৃতা

                                                                 কাল্পনিক বক্তৃতা
আজ কিশোর কুমারের জন্মদিন। উনি বেশ কিছু ভালো গান গেয়ে ছিলেন বটে, কিন্তু পোতিবাদী গান খুব বেশী গাননি। উনি ভার্সেটাইল গায়ক ছিলেন তবে আমার মতন ভার্সেটাইল শিল্পী ছিলেন না। আজ ওনার জন্মদিনে, ওনার সাথে কাটানো কিছু স্মৃতির কথা বারেবারে মনে পড়ছে। আমার জীবনের চলার পথে প্রতিটি পদক্ষেপে আমি ওনাকে খুঁজে পাই। এই! এই! এই! চোপ! চোপ! আমি কি বলছি মন দিয়ে শোনো!
ওনার সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয় যোগমায়া দেবী কলেজের সোসালে। উনি স্টেজে তখন গান করছেন "রূপ তেরা মস্তানা", আর আমি তখন সামনের সারিতে বসে। সোসালের শেষে আমাদের কালিঘাটের বাড়িতেও আসেন। তোমরা জানো না, কালিঘাট খালের পাড়ে বসেই কিন্তু উনি প্রথম "চিংগারী কোয়ি ভড়কে" গানটি গেয়ে ছিলেন।

সুদীপ্তটাও বড়ো কিশোর পাগল ছিলো। আমার আজও মনে পড়ে ডেলোর বাংলোতে সেই রাতে, সবাই তখন আমার জন্য অপেক্ষা করছিল, আমি আসতেই সুদীপ্ত গেয়ে উঠেছিল "রাত কলি এক খাওব ম্যায়ে আয়ি, অউর গলে কা হার হুয়ি"। আমি তো ওর গানে খুশি হয়ে আমার প্রিয় পেন্টিংটাই দিয়ে দিয়েছিলাম। পরে অবশ্য ও দাম দিয়েছিল। বেচারা কিশোর প্রেমের জন্যই পুলিশের হাতে ধরা পড়ল। দেবজানী কে নিয়ে পালিয়ে গিয়ে কাশ্মীরের রাস্তায় দুজনে হাত ধরে " হাম দোনো দো প্রেমী, দুনিয়া ছোড় চলে" গাওয়ার কোনো দরকার ছিলো! এখন জেলে বসে "ইয়ে ক্যায়া হুয়া, ক্যায়সে হুয়া" শুনছে। তবে লোকজন টাকা টাকা করে যখন আমার পিছনে ছোটে তখন আমার ঐ গানটার কথাই মনে পড়ে "আদমি যো দে হ্যায়, আদমি যো লেতা হ্যায়, জিন্দেগি ভর ও সাজায়ে পিছা করতি হ্যায়।"
মাস খানেক আগে আলিপুর জেলের পাশ থেকে আসছিলাম, হটাৎ জেলের ভিতর থেকে দেখি কিশোরের কন্ঠ ভেসে আসছে - " বড়ি শুনি শুনি সি হ্যায়, জিন্দেগী ইয়ে জিন্দেগী"। ড্রাইভার বলল ওটা মদনার ঘরে বাজছে। নারদার ভিডিও প্রকাশ হবার পর সত্যিই খুব ভেঙে পড়েছিলাম। তখনও ওনার গান " কুচ তো লোগ ক্যাঁহেঙ্গে, লোগোকা কাম হ্যায় ক্যাঁহনা" আমাকে লড়াই করার শক্তি দিয়েছে। আর ৩৪ বছর ধরে কিশোরের গাওয়া " ইয়ে লাল রঙ, কব মুঝে ছোড়ে গা" গানটা আমি প্রতিদিন রাতে শুনতাম।
সিপিএম যখন কুৎসা করে, কন্যাশ্রী আমাদের প্রকল্প, সাইকেল আমরা চালু করেছি, তখন আমি কানে হেড ফোন লাগিয়ে শুনি " কো ই হোতা জিসকো আপনা, হাম আপনে ক্যাহেলেতে ইয়ারো"। আরে দল থেকে যখন ঐ চাষার ব্যাটাকে বহিষ্কার করলো, তখন তো আমিই আশ্রয় দিলাম। মন্ত্রী করার পর দেখি আমাকে বলছে " হামে অউর জিনে কি চাহত না হোতি, আগর তুম না হোতে"।
এই তো সেদিন নজরুল মঞ্চের গ্রীনরুমে দুজনে একটু গপ্প করছিলাম, হটাৎ ওনার মোবাইলটা গেয়ে উঠল "পল পল পল, দিল কে পাশ তুম .."। উনিও কিশোর ভক্ত সেটা সেদিনই জানলুম। উনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন 'তোমার রিংটোন কি'? আমিও আমার রিংটোনটা শুনিয়ে দিলাম " দিলবার মেরে কবতক মুঝে ইঁউহি তড়পায়ো গে"। উনি হেঁসে জানতে চাইলেন এমন রিংটোন সেট করেছি কেন? আমিও হেসে বলেছিলাম 'CBI এফেক্ট'। তারপর উনি বললেন, শেয়ার ইট খোলো আমি একটা ভালো গান পাঠিয়ে দিচ্ছি। ওটাকে রিংটোন কোরো। তাই ওনার দেওয়া কিশোরের সেই গান আজ আমার রিংটোন। কানন, এই কানন! একটা মিসকল দাও তো! রিংটোনটা সবাইকে শোনাই।
কানন মিসকল দিতেই ওনার ফোনে কিশোরের কন্ঠ ভেসে উঠল - " কসমে ওয়াদে নিভায়েঙ্গে হাম ......."

Friday, 19 August 2016

✍✍✍✍ রাখী উৎসব ✍✍✍✍



                                                     ✍ রাখী উৎসব 
রাখীর দিবসে প্রাতকাল হইতেই কালীঘাটে ভীড় উপছাইয়া পড়িতেছে। ক্ষণকাল পূর্বে ভাইপো বৈঠকখানায় আগমন পূর্বক সমবেত সভ্যগণকে(!) ক্ষণিকের জন্য অপেক্ষা করতে বলিয়াছেন। সমাবেত সভ্যগণ নিজ নিজ উপহার হস্তে লইয়া অধীর আগ্রহে বসিয়া রহিয়াছেন। উপস্হিত সভ্যেরা(!) নিজেদের মধ্যে বাক্যালাপে ব্যস্ত, ইতিমধ্যে ভাইপো বৈঠকখানায় প্রবেশ করিয়া সবাইকে অবগত করিলেন যে 'উনি আসিতেছেন'। সভ্যগণ আকুল নয়নে দুয়ারের পানে চাহিয়া রহিলেন। সবার উদ্বেগের অবসান করিয়া, হাস্য বদনে, দন্ত বিকশিত করিয়া, সবার উদ্দেশ্যে হস্ত হেলন করিয়া উনি প্রবেশ করিলেন।
প্রথমেই রাখী লইয়া উনি ওনার স্নেহের কাননের নিকট উপস্হিত হইলেন। কাননকে রাখী পরাইতেই কানন একখানি মূল্যবান তোয়ালে ওনাকে উপহার দিয়া কহিলেন "ইহা বিদেশ হইতে আনিয়াছি"। নব্য তোয়ালেটি হস্তে লইয়া উনি কহিলেন "তোমার পুত্র নিশ্চয়ই ইহা আনিয়াছে! ইহা হইতে সোমরসের সুগন্ধ বাহির হইতেছে যে"! কানন দন্ত বিকশিত করিয়া সম্মতি জানাইলে। অতপর উনি অমিতের নিকট উপস্হিত হইলেন। রাখী পরাইবার পর অমিতকে জিজ্ঞাসিল " কি আনিয়াছ"? অমিত প্রত্যুত্তরে কহিলেন "মহার্ঘ্য ভাতা বকেয়া, পিতার ৩৪বৎসরের দেনা, তাই তিওয়ারীর লাড্ডু না লইয়া দাশুর লাড্ডু আনিয়াছি"। সুব্রত হাসিয়া কহিলেন "আমি কিন্তু শক্তিগড়ের ল্যাংচা আনিয়াছি"। খুশী হইয়া উনি কহিলেন "কেবল ল্যাংচা! আলুরচপ সিঙাড়া আনোনাই! সিঙাড়া তো তোমারও খুব প্রিয়"। পার্থের নিকট হইতে একখানি গীতাঞ্জলি উপহার পাইয়া উনি পার্থকে একখানি কথাঞ্জলী প্রত্যাউপহার (রিটার্ন গিফ্ট) করিলেন। ইতমধ্যে মুকুল তার প্রিয় পুষ্প 'শিউলী' ওনার চরনে দিয়া প্রণাম সারিয়া নিয়াছে।
কৃষক পুত্রের উপহারের মোড়কটি খুলিয়া ওনার চক্ষু কপালে উঠিয়া গেল! 'কেউটিয়া' নামক একটি বিষধর সর্প উপহার দিয়াছে। সর্পটি শান্ত দেখিয়া তাহার কারণ জানিতে চাহিলে, কৃষক পুত্র কহিলেন "বৈদেশীক তৈল উহার উপরে না ফেলিলে এ সর্প জাগ্রত হইবে না"। জ্যোতিপ্রিয় এক বস্তা গোবিন্দভোগ চাল আনিয়াছে দেখিয়া উনি কহিলেন "এই চালই তো আমি ২টাকা কেজি দরে বিতরণ করিতেছি"। অনুব্রত নিকটেই গুড় জল লইয়া দাঁড়িয়ে ছিল, ওনার কথা শুনিয়া তারস্বরে হাসিতে লাগিল। উনি ধমক দিয়া কহিলেন "অতো হাসিওনা কেষ্টা, বাড়িয়া যাইবে অক্সিজেন তেষ্টা"।
তাপসকে খুব দুঃখী দেখিয়া কহিলেন " চিন্তার কিছু নাই! শারদীয়ার পূর্বেই শ্যলক গৃহে প্রত্যাবর্তন করিবে"। মন্টু সুন্দরবনের বাঘের দুগ্ধ, সাধন ইলিশ, গৌমত 'ডানকানে চা' আর অরুপ কিছু ডেঙ্গুর ভাইরাস লইয়া সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। উনি ওদের রাখী পরাতে যাইবেন এমন সময় পশ্চাত্ হইতে রবি তাঁর লম্বায়মান হস্ত এই বামনদিগের ওপর হইতে প্রসারিত করিলেন। হটাৎ গোলযোগ শুনিয়া উনি গৃহের এক কোনে চাহিয়া দেখিলেন, বিজন ও সমীর উপহার লইয়া এগিয়ে আসিতে চাহিছে কিন্তু দেবনারায়ণ উহাদের হস্ত পশ্চাতে টানিয়া কহিতেছে "না না না না না আমি প্রথমে রাখী পরিব"।
উপস্হিত সভ্যদের রাখী পরানো সম্পন্ন হইলে উনি ভাইপো ডাকিয়া তাহার হস্তে দুটি রাখী দিয়া কহিলেন "একটিকে দিল্লিতে পাঠাইবার ব্যবস্থা করো আর অপরটিকে আলিপুর সংশোধনাগারে"। সারাটা দিন উপস্হিত সভ্যগণ প্রচুর আনন্দ করিল। ভোজনের ও চটুল নৃত্যেরও আয়োজন হইয়াছিল। সবাই দারুণ উপভোগ করিল এই রাখী উৎসব। কেবল উনি গৃহে প্রবেশ করিতে নিষেধ করিয়াছেন বলিয়া আরাবুল আর কাইজার উপহার লইয়া সারাটা দিন বাহিরে অপেক্ষারত রহিলেন।

Tuesday, 16 August 2016

স্বাদ-হীনতার বার্তা

 আজ ১৫ই আগস্ট, স্বাধীনতা দিবস। প্রায় ২০০ বছরের 'বিটিশ' অত্যাচার, খুন, ধর্ষন, লাশ গুম থেকে আজকের দিনেই ভারতবর্ষ মুক্তি পেয়েছিল। যদিও ভারতবর্ষ স্বাধীনতা পেলেও বাংলা স্বাধীনতা পায়নি! বাংলা ৩৪ বছর ধরে হার্মাদদের হাতে পরাধীন থাকার পর, আমার হাত ধরে ২০১১ সালে স্বাধীন হয়। তাই বাংলার মানুষের দুটো স্বাধীনতা দিবস পালন করে। ১৫ই আগস্ট সেন্ট্রাল স্বাধীনতা দিবস ও ২১শে জুলাই 'ইস্টেট' স্বাধীনতা দিবস। এই, এই, চোপ! চোপ! কথা বলোনা কেউ! মন দিয়ে শোনো!
'বিটিশ'রা প্রথমে এই বঙ্গে সিরাজের 'বিশ্ব বঙ্গ' সম্মেলনে এসে বলেছিল তারা এখানে বিনিয়োগ করতে চায়। সিরাজ অতো সাতপাঁচ না ভেবেই অনুমতি দেয়। পরে তারা কোনো প্রতিশ্রুতিই রাখেনি। বেআইনি ভাবে তারা একেরপর এক রাজার জমি অধিগ্রহন করতে থাকে। শুরুতেই যদি সিরাজ, শের সাহের তৈরী জিটি রোডের উপর একটা অনশন মঞ্চ বেঁধে আমার মতন আন্দোলন শুরু করতো তাহলে হয়তো 'বিটিশ'রা এতোটা এগোতে সাহস পেতো না। তবে এটাও ঠিক যে মীরজাফর দলের ভিতরে এমন গোষ্ঠীদ্বন্দ চালাচ্ছিল যেটা সিরাজ কন্ট্রোল করতে পারেনি। আসলে সিরাজ জানতো না যে 'বিটিশ'রা তখন ভারতে নীল চাষ নিয়ে যে সিন্ডিকেট রাজ চালাচ্ছিলো, তার একটা ভাগ মীরজাফরও পেতো।
এই! এই! ওখানে কারা কথা বলছে! সিসিটিভি লাগানো আছে কিন্তু! আমি সব লক্ষ্য রাখছি! হ্যাঁ যে কথা বলছিলাম, সিপিএম মাত্রেই কিন্তু হার্মাদ নয়! যেমন এই চাষার ব্যাটা, দীপালি এদের সমস্ত পাপ এখন উন্নয়নের জোয়ারে ধুয়ে গেছে। ঠিক তেমনই 'বিটিশ' মাত্রেই খারাপ, এটা একপ্রকার কুৎসা, অপপ্রচার। রামমোহন বাবু যখন এমএলএ ছিলেন তখন বেন্টিং, রিপনের মতন 'বিটিশ'রা বিধানসভায় যথেষ্ট সহায়তা করতেন।
বঙ্গভঙ্গের সময় রবীন্দ্রনাথ আমার প্রিয় ঘাসফুল আর হলুদ সুতো দিয়েই রাখী তৈরি করেন। আমাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন যে হদুল সুতোর পরিবর্তে নীল-সাদা সুতো দেবে কিনা! আমি তেমন কোনো আপত্তি না করায় উনি হলুদ সুতো দিয়েই কাজ চালান। একবার তো গান্ধীজি অনশন আন্দোলন করার সময় হটাত অসুস্থ হয়ে পড়েন। হোয়াটস অ্যাপে খবরটা পেয়ে আমি দ্রুত রবি বাবুকে নিয়ে হাজির হই। ওনার হাতেই ফলের রস খেয়ে উনি অনশন ভাঙেন। আমি গান্ধীজিকে পরে অনেক বোঝাই যে - অনশন যদি করতেই হয় তাহলে আমার মতন চকলেট খেয়ে করুন। রবি বাবুও বকাবকি করেন। তবে আজ রবি বাবুর জন্য খুব দুঃখ হয়। ওনার নোবেলটা কে ঝেঁপে দিল সেটা আমি খুঁজে বার করবোই! আমার দলীয় কর্মীদের আছে আবেদন করছি, চলুন আজকে এই স্বাধীনতা দিবসে শপত নিই আমরা সবাই মিলে নোবেল খুঁজে বার করবোই। আমি নিশ্চিত দলীয় কর্মীরা সাহায্য করলে নোবেল নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে!
এবারে পতাকা উত্তোলন হবে, 'ইন্দোনীল' একটা রবীন্দ্র সঙ্গীতের পরিবেশ সৃষ্টি করবে। বাকিরা যারা আছো, কচি নচি সবাই গলা মেলাও। এবারে আমি স্বাধীনতা 'ইস্পেশাল' একটা স্লোগান দেব। তোমরা সবাই আমার সাথে গলা মেলাবে ....
এই দিকে দিকে - তিনোমূল, এই জালিয়ানওয়ালাবাগে - তিনোমূল, এই নন্দীগ্রামে - তিনোমূল, এই বঙ্গভঙ্গে - তিনোমূল, এই আইন অমান্যে - তিনোমূল, এই চট্টগ্রামে - তিনোমূল, এই পিংলাতে - তিনোমূল, এই খগড়াগড়ে - তিনোমূল,
দাঁড়াও! দাঁড়াও! কেউ বাড়ি যাবেনা! আমাদের কেষ্টা সবার জন্য আজ গুড়জলের ব্যবস্হা করছে। সবাই খেয়ে যাবে।

Tuesday, 9 August 2016

✍✍✍ NOবেল রহস্য ✍✍✍


সকাল থেকে বৃষ্টি হয়েই চলেছে। মাঝেমধ্যে ১০-১৫মি বিরতি, তারপর আবার শুরু। ফেলুদার এখন তেমন কাজের চাপ নেই। তাই জমিয়ে খিচুড়ি আর ইলিশ দিয়ে পেট পুজো করে দুপুরবেলা খাটেতে শুয়ে শুয়ে গতকাল রাতে ডাউনলোড করা 'প্রাক্তন' দেখতে ব্যস্ত। আমারও স্কুল বন্ধ তাই পাশের সোফাতে শুয়ে আমিও 'আজব ছড়া' বইটা নিয়ে পড়তে শুরু করলাম। যদিও বইটি আমি ২১১ বার, না না ২১৩ বার পড়েছে, তবুও এটা পড়তে দারুণ লাগে। 

আসলে একেই বর্ষাকাল, বাইরে বের হওয়া যাচ্ছে না। তার ওপর স্কুল ছুটি। আসলে বাবাই স্কুলে যেতে এখন নিষেধ করেছেন। সেদিন টিভিতে খবর দেখার পর বাবাই বললেন ' তোদের স্কুলের আশেপাশে প্রচুর ময়লা আবর্জনা, পুরোসভা স্কুলের কর্মচারী কেউই ঠিকমতো পরিষ্কার করেনা। স্কুলের পিছনে থানার গ্যারেজটা তো মশার আড়ত! আগে ওগুলো পরিষ্কার হোক, তারপর স্কুলে যাবি। নাহলে নির্ঘাত ডেঙ্গি হবে"। ফেলুদা অবশ্য সেদিন বাবার কথা শুনে হেসে বলেছিল ' তোপসে, তুই মনেহয় একমাসর ছুটি পেয়ে গেলি'

বিকেল ৫টা বাজতেই কলিংবেলটা 'টিংটং' করে বেজে উঠলো। ফেলুদা শুয়ে শুয়ে ট্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়ে চারমিনারে একটা টান দিয়ে বলল ' যা দরজা খোল, লালমোহন বাবু এসেছেন'। দরজা খুলে দেখি সত্যিই লালমোহন বাবু। আমি ঘরে ঢুকে অবাক হয়ে ফেলুদার দিকে তাকাতেই, ফেলুদা শেষ হয়ে যাওয়া চারমিনারে সুখটান দিয়ে ফিল্টারটাকে ক্যারামের স্টাইকারের মতন জানালার গরাদের ফাঁক দিয়ে এক চান্সে বাইরে ফেলে বললেন ' ৪৪বছরের (৩৪+১০) পুরনো অ্যাম্বাসাডরের শব্দ চিনতে ফেলু মিত্তিরের ভুল হব'!

তারপর লালমোহন বাবুর সাথে ঝাড়া ৩ঘন্টা বাঙালি আড্ডা চলল চা সিঙাড়া তেলেভাজা সহযোগে। লালমোহন বাবুর তো কৌতূহলের শেষ নেই! আর ফেলুদাকে পেলে তো ভদ্রলোকের সময় সম্পর্কে আর কোনো হুঁশই থাকে না। বঙ্গপোসাগরে বিমান দুর্ঘটনা থেকে রাষ্ট্রপতির পাহাড় থেকে বেঁচে ফেরা। আবেশের খবর থেকে গোটা দেশের খবর। তবে গো-হত্যা নিষিদ্ধকরণের খবরটা মনেহয় জেনে বুঝেই চেপে গেলেন। হাজার হোক ব্রাহ্মণ তো! আড্ডা মোটামুটি শেষের পথে এমন সময় হটাৎ লালমোহন বাবু বললেন ' দেখেছেন মিত্তির মশাই গল্পে গল্পে আপনাকে আসল খবরটা দিতেই ভুলে গেছি! এই ভুলভুলাটিস রোগটা মনেহয় আর সারলো না! বলছি নোবেলের কেসটা শুনেছেন? আবার তদন্ত হবে! উনি নাকি নিজেই তদন্ত করবেন!

ফেলুদা আরেকটা চারমিনার ধরিয়ে বলল ' উনি যদি তদন্ত করেন তাহলে আপত্তি কিসের?' লালমোহন বাবু কিছুটা উত্তেজিত হয়ে বললেন ' যে কাজ সিবিআই পারলো না, সেটা উনি করবেন! তাহলে তো মিরাক্কেলিয়াস ব্যাপার হবে মশাই'। ফেলুদা হাওয়াতে একটা ধোঁয়ার রিং ছেড়ে বলল ' আপনি ভুলে যাচ্ছেন লালমোহন বাবু, একটা চোরই কিন্তু একটা চোরকে ভালো চেনে"। লালমোহন বাবু কিন্তু কিন্তু করে বললেন ' তা আপনি ঠিকই বলেছেন, তবে গোয়েন্দাগিরি কি ওনার কম্ম'! ফেলুদা মুচকি হেসে বললেন "সেকি মশাই আপনি গোয়েন্দা গিন্নি দেখন না! উনি হলেন আমাদের গোয়েন্দা দিদি। সারাদিন উপন্যাস নিয়ে না পড়ে থেকে মাঝেমধ্যে একটু সিরিয়াল টিরিয়াল দেখুন। তবে হ্যাঁ এবারে পুজোর জন্য কিন্তু এটা ভালো উপন্যাস হতে পারে, মদন পেলো না বেল, দিদির হাতে নোবেল"।


গেট থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠতেই গাড়িটা ৩-৪বার ঘড়ঘড় করার পর স্টার্ট নিলো। লালমোহন বাবু একগাল হেসে বললেন 'এবারে দেখছি গাড়িটা পাল্টাতেই হবে'। ফেলুদাও হেসে বললেন ' আরে না না, শুধু নম্বর প্লেটটাই পাল্টে WB জায়গায় BG (বঙ্গ) করলেই হবে'

Friday, 15 July 2016

ইন্টারন্যাশনাল তোলাবাজ


কেল্টু কেমন ছেলে সেটা আর নিশ্চয়ই নতুন করে বলতে হবে না! সুবোধ বালক বলে তার নামে কেউ কোনদিন কোনো দুর্নাম রটায়নি। তার অত্যাচারের শিকার হয়নি এমন কোনো ছেলে হোস্টেলে আছে বলে মনে হয় না! রান্নার ঠাকুর থেকে বাগানের মালী, এমনকি সুপারিনটেন্ডেন্টবাবুও বাদ যেতেন না। তবে সবচেয়ে বেশি অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে নন্টে আর ফন্টেকে।

প্রথম প্রথম হোস্টেলের সবার টিফিনে সে জোর করে ভাগ বসাতো। রান্নার ঠাকুরকে চমকে রান্নাঘর থেকে খাবার সরাতো। তবে যেদিন থেকে সুপারিনটেন্ডেন্ট সাহেব সেই কেল্টুকেই হোস্টেলের মনিটর করে দিল, সেদিন থেকেই কেল্টুর দৌরাত্ম্য লাগামছাড়া হয়ে গেলো। নিয়মিত হোস্টেলের অন্য ছেলেদের র‌্যাগিং করে ‘দাদাগিরি ফি’ মানে তোলা আদায় করতে লাগল। ইদানিং তো কেল্টুর বাড়বাড়ন্ত হোস্টেল ছাড়িয়ে, গোটা সেক্টর ফাইভে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেলুনওয়ালা থেকে গরিব রিক্সাওয়ালা পর্যন্ত তার হাত থেকে নিস্তার পেত না।

গতকাল সকালে হঠাৎ নাসিরের রুম থেকে চেঁচামেচির আওয়াজ পেয়ে নন্টে আর ফন্টে দৌড়ে গিয়ে দেখে, কেল্টুদা জোর করে নাসিরের মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করে নিচ্ছে। নাসির হোস্টেলে নতুন। মাত্র এক সপ্তাহ হয়েছে সে বাংলাদেশ থেকে এদেশে পড়তে এসেছে। একটু গো-বেচারা টাইপের ছেলে নাসির। তাই কেল্টু যখন তাকে চমকালো, তখন সে একটু ভয়ই পেয়ে গিয়েছিল। কেল্টু নাসিরের মানিব্যাগ থেকে কড়কড়ে একটা ৫০০টাকার নোট বার করে নিয়ে বললে, ‘দু’দিনের দুটো কার্লসবার্গ আর চাটের খরচ।’ তারপর নাসিরকে উদ্দেশ্য করে বললে, ‘সপ্তাহে ৫০০ করে সেলামি দিতে হবেআর হ্যাঁ, পরের বার আমি নিতে আসব না, আমার রুমে এসে দিয়ে যাবি।’

কেল্টু চলে যাবার পর নাসির তার বড়ো খালা মহসিনাকে ফোন করে সব বেত্তান্ত বললো। এমনকি কেল্টুর একটা ছবিও হোয়াটস্‌অ্যাপে পাঠিয়ে দিলো। মহসিনা খালা প্রতিবেশী দেশের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তার ওপর খালার সাথে সুপারিনটেন্ডেন্ট সাহেবের আবার মধুর সম্পর্ক। তাই নাসিরের কাছ থেকে সবটা শুনে যখন মহসিনা বিবি সুপারিনটেন্ডেন্ট সাহেবকে কেল্টুর নামে অভিযোগ করলেন, তখন একপ্রকার বাধ্য হয়েই সুপারিনটেন্ডেন্ট সাহেব পুলিশ ডাকলেন। যদিও কেল্টু যে হোস্টেলে তোলাবাজি করে, সে কথা নন্টে-ফন্টে আগে অনেকবার সুপারিনটেন্ডেন্ট সাহেবকে বলেছে, কিন্তু তখন তিনি এসব কথা কানেই তোলেনি। তখন তো সুপারিনটেন্ডেন্ট সাহেবের নয়নের মণি ছিল কেল্টু। আর তোলার টাকায় প্রায়ই সুপারিনটেন্ডেন্ট সাহেবের জন্য নিত্যনতুন খাবার নিয়ে আসতো কেল্টু।

কেল্টুকে আজ যখন পুলিশ কলার ধরে প্রিজন ভ্যানে ভরে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন হোস্টেলের সবাই তা দেখে নিজেদের মধ্যে গুজ্‌গুজ্‌ ফুস্‌ফুস্‌ করছিল। সুপারেনটেন্ডেন্ট স্যার তার রুমের বাইরে দাড়িয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললেন, ‘হতচ্ছাড়াটা বড় বেড়েছিল, এতদিনে বিদায় হলো।’ কিন্তু কেল্টুর ভবি ভোলবার নয়। প্রিজন ভ্যানে ঢোকার আগে সে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে নাসিরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘পুলিশ আমাকে বেশিক্ষণ আটকে রাখতে পারবে না। জামাইবাবুকে ফোন করেছি, বলেছে থানায় ছেলে পাঠিয়ে ছাড়িয়ে আনবে। ফিরে এসে হিসাবের খাতাটা মিলিয়ে নেব। তৈরি থাকিস্‌।’

নন্টে আর ফন্টে হোস্টেলের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। যখন প্রিজন ভ্যানটা গেট থেকে বের হচ্ছিল, তখন নন্টে কেল্টুদার দিকে তাকিয়ে ফন্টেকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘আমাদের কেল্টুদা আজ ইন্টারন্যাশনাল তোলাবাজের স্বীকৃতি পেল।’

Thursday, 7 July 2016

দাশুর দোলনা

দশটা বেজে গেছে, ঢং ঢং করে স্কুলের ঘণ্টা পড়ে গেল। সবাই যে যার ক্লাশে চলে গেল, এমন সময় দেখি পাগলা দাশু, স্কুল থেকে দেওয়া নতুন জুতো পরে পিঠে সরকারি ব্যাগ ঝুলিয়ে, মুখে একগাল হাসি নিয়ে ক্লাসে ঢুকছে। নবীনচাঁদ  বলল, ‘‘শুনেছিস? আমাদের স্কুলে দোলনা বসছে।’’ যেমন বলা, অমনি দাশরথি হঠাৎ হাত-পা ছেড়ে বইটই ফেলে খ্যাঃ খ্যাঃ খ্যাঃ খ্যাঃ করে হাসতে হাসতে একেবারে মেঝের ওপর বসে পড়ল! পেটে হাত দিয়ে গড়াগড়ি করে, একবার চিত হয়ে, একবার উপুড় হয়ে, তার হাসি আর কিছুতেই থামে না! দেখে আমরা তো অবাক!

পণ্ডিতমশায় ক্লাসে এসেছেন, তখনো পুরোদমে তার হাসি চলেছে। সবাই ভাবল, ‘‘ছোঁড়াটা খেপে গেল নাকি?’’ যা হোক, খানিকটা হুটোপুটির পর সে ঠান্ডা হয়ে, ব্যাগ থেকে ‘কথাঞ্জলি’ বার করে ফার্স্ট বেঞ্চের এক ধারে বসে পড়ল। পণ্ডিতমশায় বললেন, ‘‘ওরকম হাসছিলে কেন?’’ দাশু নবিনচাঁদকে দেখিয়ে বলল, ‘‘স্যার, নবীন বলল, আমাদের স্কুল নাকি এবারে সেন্ট্রাল পার্ক মডেলে তৈরী হবে!’’ পণ্ডিতমশায় তাকে বললেন, ‘‘তোমাকে না আজ স্কুলে আসতে নিষেধ করেছিলাম দাশু। আজ বোর্ড থেকে কয়েকজন আসবেন স্কুল ইনস্পেকশন করতে। কোনোরকম বদমায়েশি করবে না। তাহলে কিন্তু আমার চাকরি চলে যাবে।’’ দাশু খানিক মাথা চুলকে বলল, ‘‘আচ্ছা স্যার, যদি আপনার চাকরি চলে যায়, তাহলে কি আপনি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের কোটায় আবার চাকরি পাবেন?’’ পণ্ডিতমশায় খুব কড়ারকমের ধমক লাগিয়ে তাকে বললেন, ‘‘আর একবার যদি তুমি মুখ খোলো তাহলে চাব্‌কে লাল করে দেব। এখন যাও গিয়ে পিছনের বেঞ্চে গিয়ে বোসো।’’ কিন্তু পাগলার তাতেও লজ্জা নেই, সে ‘কথাঞ্জলি’ বইটা দিয়ে মুখ আড়াল করে ফিক্‌ফিক্ করে হাসতে হাসতে পিছনের বেঞ্চে গিয়ে বসল।

কিছুক্ষণ পরে ইনস্পেক্টর সদলবলে এসে পৌছোলেন। প্রথমেই আমাদের ক্লাসে ঢুকে ইনস্পেক্টর প্রশ্ন করলেন, ‘‘আচ্ছা বলতো, কোলকাতার কাছে গড়ে ওঠা একটা স্মার্ট সিটির নাম কি?’’ কেউ উত্তর দিতে পারছে না। এমন সময় দাশু পিছনের বেঞ্চ থেকে হাত তুলল। পন্ডিতমশাই দাশুর দিকে কট্‌মট্‌ করে তাকিয়ে হাত নামাতে ইশারা করলেন। কিন্তু কে কার কথা শোনে! দাশু এবারে নিজে দাঁড়িয়ে বলল, ‘‘স্যার, ওটা আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর তৈরী রাজারহাট।’’ ইনস্পেক্টর-‘‘ইয়েস! রাজারহাট, উত্তরটা সঠিক। তবে ওটা তো ওনার তৈরী নয়!’’ দাশু-‘‘না স্যার, ওটা উনিই তৈরি করেছেন। আর ইঁট বালি সিমেন্ট সব সব্যদা সাপ্লাই দিয়েছেন। জানেন স্যার! আমি শুনেছি, তাজমহল তৈরীর সময় শাহজাহানকেও সব্যদা মার্বেল সাপ্লাই দিয়েছিলেন।’’

দাশুর এক্সট্রা উত্তরে ইনস্পেক্টর একটু থমকে গেলেন, তারপর দ্বিতীয় প্রশ্ন করলেন, ‘‘আচ্ছা বলতো, একজন শিক্ষকের বেতন যদি প্রতি বছরে ১৪শতাংশ করে বাড়ে, তাহলে যে ব্যক্তির বেতন এখন ১৫হাজার টাকা তার বেতন পাঁচ বছর পরে কতো হবে?’’ আবার দাশু সবার আগেই হাত তুলে দাঁড়িয়ে। পন্ডিতমশাই আবার তার দিকে কট্‌মট্‌ করে তাকিয়ে। অন্য কেউ পারছে না দেখে বাধ্য হয়ে ইনস্পেক্টর দাশুকে বলতে বললেন। দাশু বলল, ‘‘স্যার, এক টাকাও বাড়বে না। ওটা তো রাজ্য সরকারের আন্ডারে।’’

ইনস্পেক্টর এবারে পন্ডিতমশাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘‘আপনার এই ছাত্র তো দেখছি একেবারে রত্ন।’’ পন্ডিতমশাই বললেন, ‘‘স্যার, ওটা একটা গাধা! ওকে দিয়ে কিস্যু হবে না।’’ দাশু এবারে গম্ভীরভাবে বলল- ‘‘স্যার, আমি বড় হয়ে একদিন কিন্তু উপাচার্ষ হবো।’’ পন্ডিতমশাই রেগে গিয়ে বললেন, ‘‘ওরে ছাগল! উপাচার্ষ হতে গেলে কতো পড়াশুনা করতে হয় জানিস! পি এইচ ডি করতে হয়।’’ দাশু বলল, ‘‘স্যার, এখন আর ওসব পি এইচ ডি লাগে না! আর যদি বলেন একান্ত দরকার, তাহলে আমি অমন ডিগ্রি দুদিনেই বানিয়ে নিতে পারি। কোথাকার ডিগ্রি লাগবে বলুন না! ইস্ট জর্জিয়া, নাকি উত্তরবঙ্গ!’’

ইনস্পেক্টর এবারে নিজেই হেসে ফেললেন দাশুর উত্তর শুনে। তারপর বললেন, ‘‘আচ্ছা, তুমি এতো কিছু জানো, তোমার এতো জ্ঞান, তাহলে পিছনের বেঞ্চে বসো কেন?’’ দাশু এবারে ফিক্‌ করে হেসে বলল, ‘‘দাদা বলেছে পিছনের বেঞ্চে বসতে। কারণ ছুরিটা নাকি পিছন থেকেই আসে।’’


নবীন, কেষ্টা ও ক্লাসের বাকি বন্ধুরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগল – ‘‘আচ্ছা, দাশু কি সত্যি সত্যি পাগল, না, কেবল মিচ্‌কেমি করে?’’