Friday, 12 January 2018

পাগলা দাশু

আজ অভিকে হাসিমুখে লাফিয়ে লাফিয়ে স্কুলে ঢুকতে দেখে সবাই অবাক! কেষ্টা, নবিনচাঁদ ছুট্টে গেলো অভির কাছে। কেষ্টা জিঞ্জেস করলো, ভাই আজ এতো খুশির রহস্যটা কি? নবিনচাঁদ জিজ্ঞেস করলো, বিশ্ব বাংলার বলটা পিসি কি তোকে দিয়ে দিলো নাকি! অভি কেবল হাসতে লাগলো। দাশু একমনে বেঞ্চিতে ঘসে ঘসে কি একটা লিখছিলো। জগবন্ধু এসে দাশুকে বললো, ব‍্যাপারটা কিরে দাশু, অভি এতো লাফালাফি করছে কেন? দাশু বললো, অ্যাক্সিডেন্টের পর থেকেই ওর মাথাটা গেছে। মাঝেমধ্যেই গরম হয়ে যায়, তখন এমন লাফালাফি করে। জগবন্ধু বললো, তবে যে ডাক্তার বললো অভি পুরো সুস্থ। দাশু হেসে বলল, ওরম মনে হয়!

অভি ক্লাসে ঢুকতেই জগবন্ধু অভির মাথায় একমগ জল ঢেলে দিলো। শীতেকালে এমনিতেই অভি সপ্তাহে একদিন স্নান করে। তাও গরম জলে। নেহাত তখন পাশে কেষ্টা আর নবিনচাঁদ ছিল, নাহলে জগবন্ধুর জগত ছাড়া হওয়া থেকে কেউ আটকাতে পারতো না। দুজনে মিলে অভিকে জাপটে ধরে রাখে। অভি চেঁচাতে থাকে, হারামজাদাটাকে আজ মেরেই ফেলবো! জগবন্ধু কাঁচুমাচু হয়ে বলতে লাগলো, দাশুই তো আমাকে বললো অভির মাথা মাঝেমধ্যে গরম হয়ে যায়! তাই আমি...। মিনিট দশেক বাদে অভি শান্ত হতে কেষ্টা জিঞ্জেস করলো, কি গুরু কেসটা কি বললে না তো! অভি বুক ফুলিয়ে বললো, আজ আমার পিসি ডক্টর হয়ে গেলো! নবিনচাঁদ উত্তেজিত হয়ে বললো করলো, নিশ্চয়ই হার্ট স্পেশালিস্ট! অভি ঘাড় নেড়ে না বললো। জগবন্ধু বললো, তাহলে ডেন্টিস্ট। পাড়ার মোড়ে পিসির ইয়া বড়ো দাঁত বার করা ছবি টাঙিয়েছে দেখেছি। কেষ্টা জগবন্ধুর দিকে কটমট করে তাকাতেই জগা চুপ হয়ে গেল। শেষে অভিই বলল, আরে এটা ঐ ডাক্তার নয় ডক্টরেট উপাধি দেওয়া হয়েছে। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পিসির 'পোতিভার' সম্মান জানিয়ে এটা দিয়েছে। দাশু এতক্ষণ ওদের কথা শুনছিল, এবারে সে ফোড়ন কাটলো, তা পিসি কবে ইস্ট জর্জিয়ার উপাধিটা রিটার্ন করলো? অভি দাশুর কথার উত্তর না দিয়েই পিসির গুণকীর্তন করতে লাগলো। পিসি সমাজ সেবা করে, গান করে, কবিতা লেখে। দাশু আবার বলল, এপাং ওপাং ঝপাং। অভি উপেক্ষা করে বলেই চললো, পিসি পাহাড় জঙ্গল নিয়ে লেখা বই, গীতাঞ্জলি কথাঞ্জলী নানান বই আছে, পিসি দারুণ ছবিও আঁকে। দাশু আবার ফোড়ন কাটলো, এখন আর আঁকে না, খরিদ্দার এখন জেলে। এবারে অভির ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলো। রেগে গিয়ে অভি দাশুকে বলতে লাগলো, আমার পিসির পিছনে লাগলে তোমার পিছনে অ্যাটম বোমা ফাটিয়ে দেব। এটা শুনেই নবিনচাঁদ বলল, তোর পিসির অ্যাটমবোমা বিষ্ফোরণের ছবিটা দারুণ।

এমন সময় প্রধানশিক্ষক বিষ্টুবাবু ক্লাসে প্রবেশ করলেন। ঝগড়া বন্ধ করে যে যার জায়গায় চুপচাপ বসে পড়লো। তোমাদের জন‍্য একটা সুখবর আছে। এবার থেকে প্রতিবছর যারা পরীক্ষায় প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় হবে তাদের স্কলারশিপ দেওয়ার হবে। জগবন্ধু, স‍্যারের প্রিয় ছাত্র। তাই দিকে তাকিয়ে বিষ্টুবাবু বললেন, জগবন্ধু মেডেল হাতছাড়া করলে চলবে না! কেষ্টা বললো, স‍্যার হঠাৎ করে এই স্কলারশিপ কি উপলক্ষে চালু হলো? বিষ্টুবাবু বললেন, আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষামন্ত্রীর স্ত্রী গত হয়েছেন, তাই তার স্মরণে এটা উনি চালু করলেন। জগবন্ধু হাতের গাঁট গুনছে দেখে বিষ্টুবাবু জিঞ্জেস করলেন, কি হিসাব করছো? জগবন্ধু আফসোসের সুরে বলল, তিনটে বছর প্রথম হওয়া বৃথা হয়ে গেলো! যদি বছর খানেক আগে এটা চালু হতো...। বিষ্টুবাবু জিভ কেটে বললেন, ছিঃ ছিঃ অমন বলতে নেই! পিছনের বেঞ্চে বসে কেষ্টা আর দাশু ফিসফিস করে কথা বলছিল। বিষ্টুবাবুর চোখ যেতেই উনি কেষ্টাকে জিজ্ঞেস করলেন, কি আলোচনা চলছে শুনি! তোমাদের তো এ জন্মেআর স্কলারশিপ পাওয়ার আশা দেখছি না! কেষ্ট বলল, স‍্যার খাদ‍্যমন্ত্রীর স্ত্রী মারা গেলে কি স্মৃতির উদ্দেশ্যে এক প‍্যাকেট করে মিহিদানার প‍্যাকেট দেওয়া হবে? বিষ্টুবাবুর বেতের লাঠি কেষ্টার পিঠে পড়তেই কেষ্টা কাঁদতে কাঁদতে বলল, স‍্যার দাশু আমাকে বলেছে।

বিষ্টুবাবু ক্লাস থেকে বের হতে যাবেন এমন সময় নবিনচাঁদ বলল, স‍্যার আগামীকাল কি স্কুল ছুটি থাকবে? বিষ্টুবাবু রেগে গিয়ে বললেন, কোন দুঃখে! পড়াশোনার নাম নেই, কেবল ছুটি! নবিনচাঁদ ধমক খেয়ে কাঁচুমাচু হয়ে বলল, না মানে দাশু বলছিল অভির পিসি ডক্টর হয়েছে সেইজন‍্য আগামীকাল স্কুল অফিস কাছারি সব ছুটি থাকবে। স‍্যার যখন নবিনচাঁদকে ধমকাচ্ছিল তখন দাশু পিছনের বেঞ্চে বসে মিচকে মিচকে হাসছিল।

আচ্ছা, দাশু কি সত্যি সত্যি পাগল, না কেবল মিচ্‌‌কেমি করে ?

Monday, 11 December 2017

চারমূর্তি

শীত পড়তেই এবছর কোথায় পিকনিক করতে যাওয়া হবে সেই নিয়ে জোর ঝামেলা হাবুল আর প‍্যালার মধ‍্যে। হাবুলের ইচ্ছা বোলপুরে তাই হাবুল বলল, বোলপুর হলো 'কবিগুড়ি'র দ‍্যাশ। ছাতিম গাছের তলে বইস‍্যা কচি পাঁঠার ঝোল আর ভাত, ভাবলেই জিভে জল চইলা আ্যাইসে। তাছাড়া আমাগো মামা হইচে বীরভূমের ডিএসপি, সবাই তাকে দেইখ‍্যা সমীহ কইর‍্যা চলে। প‍্যালা এই শুনে বলল, থাক হাবুল, কেষ্টার হুমকি শুনে তোর মামার যে প‍্যান্ট ভিজে গিয়েছিল সেটা আমরা সবাই দেখেছি। তারচেয়ে বরং কোলকাতার কাছাকাছি নিউটাউন রাজারহাটের আশেপাশে কোথাও একটা করলে হয়। হাবুল বলল, আর জায়গা পেলিনা, মাংসের ঝোল কড়ায় ফুটবে আর হঠাৎ বিশ্ব বাংলার বল গড়িয়ে এসে সব উল্টেপাল্টে দিক আরকি!

এমন সময় ক‍্যাবলা বলল, ঐ তো টেনিদা আসছে। প‍্যালা পিছনের দিকে একবার তাকিয়েই তাড়াতাড়ি চানাচুরের ঠোঙাটা উল্টে পুরোটা গালের মধ‍্যে ঢেলে দিলো। টেনিদা এসে মাথায় চাঁটি মারতেই প‍্যালার মুখ দিয়ে চানাচুর বেরিয়ে পড়লো। টেনি মুখুজ‍্যেকে ফাঁকি দেওয়া অতো সহজ নয়! যা এখুনি আমার জন‍্য ঝালমুড়ি নিয়ে আয়। অগত্যা প‍্যালা ঝালমুড়ি আনতে চলল। টেনিদা তারপর হাবুল আর প‍্যালার সব যুক্তি শুনে বলল, পিকনিক করতে হয় এমন এক জায়গায় যেখানে পাড়াহ থাকবে, সমুদ্র থাকবে, ঘন জঙ্গল থাকবে, তা নাহলে অ্যাডভেঞ্চার হয় নাকি! হাবুল বলল, এতো ডেলো, মন্দারমনি আর জঙ্গলমহলের ককটেল, এমন জায়গা বাংলায় কোথাও আছে বলে শুনিনি! ক‍্যাবলা এতক্ষণ সব শুনছিল, এবারে সে বলল, আচ্ছা টেনিদা পিকনিকটা লিলুয়ায় করলে কেমন হয়? টেনিদা গাঁট্টা মেরে বলল, বাংলা, বিশ্ব বাংলায় পরিনত হয়ে গেল আর তুই এখনও লিলুয়ার মায়া ছাড়তে পারলি না!

এমন সময় প‍্যালা বলল, আজকে হাবুলের পিসি ডি-লিট পাওয়ার খুশিতে খাওয়াবে বলেছিল না? টেনিদা প‍্যালার মাথায় একটা জোরে গাঁট্টা মেরে বলল, হতচ্ছাড়া এতক্ষনে মনে পড়লো! আমি তাই এসে থেকে ভাবছি আজ কোথায় যেন একটা খাওয়া আছে। চল তাড়াতাড়ি চল, খিদেটা হঠাৎ আবার বেড়ে গেল। হাবুল বলল, কিন্তু আমাদের পিকনিক কোথায় হবে সেটা তো ঠিক হলো না! টেনিদা এবার রেগে গিয়ে বলল, মেফিস্টোফিলিসের মতন কথা বলিস না হাবুল, খালি পেটে হাজার চেষ্টা করলেও আমার পিকনিকের স্পটের নাম মনে পড়বে না।

হাবুলের বাড়িতে চারমূর্তি হাজির হতেই পিসি গরম গরম আলুরচপ আর বেগুনি খেতে দিলো। যথারীতি টেনিদা বাকিদের একটা করে দিয়ে নিজে সবটাই উদরস্ত করলো। তারপর জল খেয়ে একটা ঢেকুর তুলে বলল, কে বলে বাংলার শিল্পের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল নয়! পিসি হেসে বলল, তোমরা একটু বোসো আমি বাকি খাবারের জোগাড় একটু সেরে নিই! হাবুল বাকিদের নিয়ে তখন পিসির স্টাডিরুম ঘুরিয়ে দেখাতে লাগলো। দেওয়ালে সব পিসির আঁকা ঐতিহাসিক ছবি। হঠাৎ ক‍্যাবলা বলল, এই হাবুল সেই অ্যাটম বোম বিষ্ফোরণের ছবিটা দেখছি না! হাবুল বলল, ওটা কদিন আগে পিসি রাষ্ট্রপতিকে উপহার দিয়েছে। প‍্যালা টেবিল থেকে একটা বই হাতে নিয়ে পড়তে লাগলো, 'এপাং ওপাং ঝপাং'। এটা শুনেই টেনিদা বলল, এদিকে খিদেতে আমার পেট চুঁই চুঁই করছে আর তোরা হরলিক্সের আ্যাড শোনাচ্ছিস! প‍্যালা বলল, আরে এটা অ্যাড নয়, এটা পিসির লেখা কবিতা!

এমন সময় পিসির ঢাক শুনে সবাই ছুটে গিয়ে রান্নাঘরে হাজির হলো। মাজ, মাংস, মিস্টি, এলাহি ব‍্যাপার। প‍্যালা দেখে বলল, এতো 'আহারে বাংলার' স্টল! টেনিদা রেগে গিয়ে বলল, প‍্যালা, তুই একদম বেশি খাবিনা। ব‍্যাটা পিলে রুগী, কাঁচা জল খেলে অম্বল হয়। তারপর টেনিদা নিজেই যথারীতি সিংহভাগ খাবার সাবাড় করে দিলো। এতে বাকিদের যথারীতি খুব রাগ হলো। তাই খাবার শেষে পিসি টেনিদাকে মিস্টি করে ধমক দিয়ে বলল, টেনি ম‍্যাক্সিমাম খেও না, মিনিমাম খাও। টেনিদা হেঁসে বলল, জিআই তকমা পাওয়ার পর নবীন ময়রার রসগোল্লার স্বাদ দ্বিগুণ ভালো হয়ে গেছে।
(পুরোটাই কাল্পনিক গল্প, বাস্তবের সাথে মিল থাকলে কাকতলীয়)

Wednesday, 15 November 2017

রসগোল্লা রহস্য

আজ রবিবার, তোপসের টিউশন পড়তে যাওয়া নেই। তাই বিকালবেলা সোফায় শুয়ে শুয়ে ইনস্টাগ্রামে সদ‍্য শুরু হওয়া ফ্লিম ফেস্টিভ্যালের ছবি দেখছে। শাহরুখ আর পিসির ছবি দেখে তার হঠাৎ 'করন অর্জুন' সিনেমার কথা মনে পড়ে গেল। ব‍্যাকগ্রাউন্ডে মনে হলো গান বাজছে, বন্ধন ইয়ে, প‍্যার কা বন্ধন হ‍্যায়। তোপসের চোখে অটমেটিক জল এসে গেলো। তোপসে দেখল পাশে বসে ফেলুদা তখন টিভিতে খবর দেখছে, কেষ্টা প্রকাশ‍্যে হুমকি দিচ্ছে। এমন হুমকি তো মাফিয়া গুন্ডারা দেয়, তোপসের মুখে এই কথা শুনে ফেলুদা বলল, সাধে কি আর উনি বলেছেন, আমি গুন্ডা কন্ট্রোল করি।

এমন সময় কলিং বেজ বেজে উঠলো। দরজা খুলতেই লালমোহন বাবু রেগেমেগে হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করলো। তারপর সোফাতে ধপাস করে বসে বলল, হরেন্ডাস ব‍্যাপার মশাই! কি ব‍্যাপার ফেলুদা জিঞ্জেস করাতে লালমোহন বাবু বললেন, দিব‍্যি আপনার বাড়িতে আসছিলাম। নিউ টাউনের সিগন‍্যালে দাঁড়িয়ে আছি হঠাৎ গাড়ির পিছনে জোর ধাক্কা। প্রথমে ভেবেছিলাম কোনো গাড়ি এসে ঠুকলো বুঝি! কিন্তু নেমে দেখি হরেন্ডাস ব‍্যাপার, গাড়ি না! আমাদের গরমেন্টের তৈরি বিশ্ব বাংলার বল। ব‍্যাক লাইটটা ভেঙে গুড়ো হয়ে গেলো! ফেলুদা মুচকি হেসে বললেন, ওটা ভাইপোর বল। তোপসে অবাক হয়ে বলল, ওটা তো সরকারি বল! ফেলুদা বলল, বল গড়াগড়ি খাওয়ার আগে পর্যন্ত সবাই সেটাই জানতো।

লালমোহন বাবু ফেলুদাকে বলল, তা এবারে শীতে কোথায় যাওয়া হবে ঠিক করলেন কিছু? ফেলুদা একটা চারমিনার ধরিয়ে দুটো রিঙ ছেড়ে বললেন, গ‍্যাং বা ড‍্যাং তো যাওয়া যাবেনা! পাহাড় খুব জোর হাসছে। লালমোহন বাবু উত্তেজিত হয়ে বললেন, তাহলে রাজস্থানেই যাওয়া হোক। সেই কবে সোনারকেল্লা দেখেছিলাম, আপনার মনে আছে? ফেলুদা ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো। লালমোহন বাবু বললেন, ছোট্টো ছেলে মুকুলটা তো ভয়ে আমার কোলের ভিতর ঢুকে পড়েছিল। আচ্ছা মিত্তির মশাই, মুকুল অনেক বড়ো হয়ে গেছে না! এখনও কি ভয় পায়? ফেলুদা চারমিনারে আরেকটা টান দিয়ে বলল, হ‍্যাঁ ভয় পায়। তবে সিবিআইয়ের, তাইতো সে এখন পদ্ম বনে লুকায়। লালমোহন বাবু ফেলুদার কথার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে না পেরে তোপসের মুখের দিকে তাকায়। তারপর ফেলুদাকে উদ‍্যেশ‍্য করে বলেন, মুকুল সম্বন্ধে আরেকটি প্রশ্ন করতে পারি? ফেলুদা ঘাড় নাড়তে লালমোহন বাবু বললেন, মুকুল কি কাঁটা বেছে পদ্ম বনে ঢুকেছে?

ফেলুদা চারমিনারের শেষটা অ্যাসট্রেতে গুঁজে লালমোহন বাবুকে বললেন, রহস্য উপন্যাসের জন‍্য রাজস্থানে না গিয়ে দেগঙ্গা বা ভাঙড়ে যেতে পারেন। প্রতিদিনই মার্ডার হচ্ছে, সবাই জানে খুনি কে, কিন্তু কেউ মুখ খুলছে না। লালমোহন বাবু অবাক হয়ে, বলেন কি মশাই! কেন কেউ মুখ খুলছে না? ফেলুদা হেসে বলেন, ওটাই তো রহস্য। তোপসে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল, তুমি কি ডেঙ্গুর কথা বলছো! ফেলুদা তোপসের পিঠ চাপড়ে বলে, সাবাস! আস্তে আস্তে তুই আমার অ্যাসিসেন্ট হওয়ার যোগ‍্য হচ্ছিস। লালমোহন বাবু অবাক হয়ে বলেন, ডেঙ্গু তো বাংলায় নেই! ওরা তো ভিনদেশী। ফেলুদা লালমোহন বাবুকে বলল, বুঝলেন গাঙ্গুলী বাবু ডেঙ্গু নিয়ে লিখলে একটা সমস‍্যা আছে। উপন্যাস আপনি প্রকাশ করতে পারবেন না। তার চেয়ে বরং আপনি রসগোল্লা নিয়ে একটা উপন্যাস লিখুন। সদ‍্য ওড়িশা থেকে যুদ্ধ জয় করে ফিরেছে। মার্কেটে ভালো খাচ্ছে সবাই। দুদিনেই জুকেরবার্গের সুগার ৪০০ ছাড়িয়ে গেছে। লালমোহন বাবু হেসে বললেন, এটা দারুণ বলেছেন। তাছাড়া রসগোল্লার ওপর আমার দুর্বলতা রয়েছে অনেকদিন থেকেই। কিন্তু উপন্যাসের নাম কি দেব? লালমোহন বাবু মাথা চুলকাতে লাগলেন।

বাড়ি ফেরার সময় গাড়ির দরজা খুলতে গিয়ে হঠাৎ চিৎকার করে বলে উঠলেন, পেয়েছি! পেয়েছি! তারপর গদগদ মুখে ফেলুদার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার পরবর্তী উপন্যাসের নাম 'রসগোল্লা রহস্য'। ফেলুদা প্রত‍্যুতরে হেসে বললেন, এবারে আপনার ডি-লিট পাওয়া আর কেউ আটকাতে পারবে না...

Thursday, 19 October 2017

ভূত চতুর্দশীর গল্প

ভূত চতুর্দশীর রাতে কালীঘাট শশ্মানে বেশকিছু বিখ‍্যাত ভূত জমায়েত হয়েছেন। সবাই মিলে রবি'দাকে, মানে রবি ঠাকুরকে সভার সভাপতি নির্বাচিত করেছেন। সভাপতির চেয়ারে বসে...

রবি ঠাকুর - যাক ছ-বছর ট্রাফিক সিগন‍্যালে ঝোলার পর আজ অন্তত একটু বসতে পারলুম। যা দিনকাল পড়েছে এখন তো রাস্তাঘাটে বেরোতে ভয় লাগে। সেদিন এসবিআই ব‍্যাঙ্কে গিয়েছিলাম একটা দরকারে। ক‍্যাশ কাউন্টারের নতুন ছোকরাটা আমাকে চিনতেই পারলো না! যখন বললাম, আমি রবীন্দ্রনাথ তখন গম্ভীরভাবে বলল, ওহ আপনিই আমাদের কোচবিহারের এক স্টাফকে শুয়োরের বাচ্চা বলেছিলেন তাই না! অবস্থা বেগতিক দেখে আমি সেখান থেকে কেটে পড়লুম।

সিরাজউদ্দৌলা - যাই বলেন, পরিবর্তনের থেকে ব্রিটিশ পিরিয়ড অনেক বেটার ছিল। ওদের বড়লাটকে খাজনা দিলেই মিটে যেত। এখন তো কচিনেতা, বড়নেতা, মিনিমাম ম‍্যাক্সিমাম হাজার ঝামেলা। নীলকর সাহেরাও এদের তোলাবাজী সিন্ডিকেট দেখে লজ্জা পেত।

নেতাজি - হ‍্যাঁ, যাস্ট ভাবা যাচ্ছে না! আমার বাড়ি মেরামতি হবে সেখানেও সিন্ডিকেট ঢুকে পড়েছে! আমার পাত্তা দিস না ঠিক আছে, নাতি তো তোদের দলই করে। তার মুখ চেয়ে অন্তত ছাড় দিতে পারতো!

চিত্তরঞ্জন- তুই একবার ভেবে দেখ সুভাষ, আমরা যে ঘরে বসে কর্পোরেশন চালিয়ে ছিলাম, সেই ঘরে সিবিআই ঘুষখোরটা কিভাবে ঘুষ নিয়েছে সেটার তদন্ত করার জন‍্য যাচ্ছে।

নজরুল - আমিই বৃথাই লিখেছিলাম, কারার ই লৌহ কপাট, ভেঙে ফ‍্যাল... ব্রিটিশ পিরিয়ডে উনি থাকলে, কারাগার ভাঙার কোনো দরকারই পড়তো না। উনি থানায় গিয়ে ভাঙচুর করে, চমকিয়ে ধমকিয়ে ছাড়িয়ে আনতেন।

সত‍্যেন্দ্রনাথ দত্ত - 'আজব ছড়া' বইটা পড়ার পর বুঝেছি, কবিতার ছন্দ কিভাবে মেলাতে হয়।

অবনীন্দ্রনাথ - আমি এখনও ভেবে উঠতে পারিনি ঐ ছবিটার দাম কিরে ১কোটি ৮৬লক্ষ হলো! তবে কন‍্যাশ্রী পুরষ্কার নেওয়ার সময় ও যে ছবিটা উপহার দিয়েছিল, সেটা যে ব‍্যাঙের পৌস্টিকতন্ত্রের সেটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল।

বিদ‍্যাসাগর - জালি সার্টিফিকেটধারীদের নিয়ে কি আর বলবো! তবে ওদের সবার উচিত একবার করে বর্ণপরিচয় পড়া। ফ্লেক্সে যা বানান ভুল করে!

শ‍্যামা প্রসাদ - উনি কেবল উন্নয়নের জোয়ার আনেননি, উনি এ রাজ‍্যে আরএসএসের জোয়ারও এনেছেন। দাঙ্গা দাঙ্গা খেলায় উনি আমাদের মতন সমান পারদর্শী। আর হবে নাই বা কেন, উনি যে সাক্ষাৎ 'দুর্গা'।

রামকৃষ্ণ - আমার স্ত্রী'র ওপর থেকে আমার বিশ্বাস উনিই তুলে দিয়েছেন। আমার নয়, ওনার অনুপ্রেরণায় প্রোমোটাররা মানুষের মধ্যে 'টাকা মাটি মাটি টাকা' এই বানী বেশ ভাল ছড়িয়েছে।

বিবেকানন্দ - ওনার বড়দা তো আমার শিকাগো বক্তৃতার পাঞ্চ লাইনটা, 'আমার প্রিয় ভাই ও বোনেরা' ঝেপে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেলো। ঐ ভাষনের শুরুতেই বলে তো, মেরে প‍্যায়ারে ভাইয়ো ওউর ব‍্যাহেনো...

সত‍্যজিৎ - ওনার কৃপায় আমি মারা গিয়েও কিন্তু এখনও'ধরনী'তেই আছি। বেঁচে থাকলে ফেলুদা সিরিজে আর কয়েটা অ্যাড করতে পারতুম। এই যেমন ডেলোতে কেলো, পাতলেবাস সরগরম, জঙ্গলের হাসির রহস্য। তবে মুকুলের জন‍্য আজ খুব কষ্ট হয়। বেচারা আজও দুষ্টু লোক চিনতে শিখলো না।

সত‍্যেন্দ্রনাথ বসু - আমি শুধু ভাবি, ব‍্যাটা কেষ্টা, কেমিস্ট্রির ক জানেনা। কিন্তু বোমার মশলার মাপ কি করে এত নিখুঁত করে!

রামমোহন - আমি কোন বিধানসভা থেকে ভোটে জিতে এমএলএ হয়েছিলাম সেটা আজও খুঁজছি।

জগদীশ চন্দ্র - আমি গাছের প্রাণ আছে বলেছিলাম। আর এরা তাতেই বার খেয়ে সিঙ্গুরের কংক্রিটের জমিতে সর্সে চাষ করলো! এবারও ভেবে দেখলনা গাছ গুলো বাঁচবে কি করে!

ভূত চতুর্দশীর সভা বেশ ভালোই চলছিলো। হঠাৎ একটা বাচ্চা ছেলে আর একটা বাচ্চা মেয়ে খেলতে খেলতে সেখানে চলে আসে। এতরাতে দুটো বাচ্চাকে শ্মশানে খেলতে দেখে সবাই হকচকিয়ে যায়। তারা কোথা থেকে এখানে কিভাবে এসেছে তা জিঞ্জেস করাতে। বাচ্চা ছেলেটি জানালো, দিন চারেক আগে তাদের দুই ভাইবোনের একসাথে ডেঙ্গু হয়। শুনে বাকিরা সবাই চুপ হয়ে যায়। কেবল একে অপরের মুখের দিকে দেখতে থাকে। তখন তার ছোট বোনটি বলল, না না আমাদের ডেঙ্গু হয়নি। আমরা অজনা জ্বরে মারা গিয়েছি।

(কাল্পনিক গল্প, বাস্তবের সাথে কোনো মিল নেই)

Thursday, 5 October 2017

কার্নিভাল কাহিনী

দুর্গা= কৈ রে, বলি তোদের সাজুগুজু করা হলো! তাড়াতাড়ি নে, তোদের পিসি রেড রোডে অপেক্ষা করছে তো। 

সরস্বতী = মা, এই স্কার্টটা কেমন? এটা পরেই ভাবছি এবারে ক‍্যাট ওয়ার্ক করবো! 

দুর্গা = তুই কি পাগল নাকি! এই টাইট মিনিস্কার্ট পরে ওখানে কেউ হাঁটে নাকি! যদি হঠাৎ জ্বর বমি হয়ে যায়! 

সরস্বতী = আরে চিন্তা করছো কেন! আঙ্কেল তো এবারের কার্নিভালে নেই, ভুবনেশ্বরে আছে। তাই কোনো চিন্তা নেই!

দুর্গা = ওরে আঙ্কেল নেই তো কি হয়েছে, আঙ্কেলের ছেলেরা তো আছে। যদি ফস করে ঢুকে পড়ে! তাছাড়া আশেপাশে অনেক দুষ্টু দামালরা থাকবে। বিদায় বেলায় যদি একটা ছোট্টো ঘটনা ঘটে যায়! তোর পিসি তো ক্ষতিপূরণ ঘোষনা করেই খালাস হয়ে যাবে।

সরস্বতী = তাহলে কি পরবো? দিদি নম্বর ওয়ানে জেতা শাড়িটা? নাকি এবছরের লেটেস্ট, বাহুবলী চুড়িদার?

দুর্গা = চুড়িদারটাই পর। বাহুবলী নামটার মধ্যে একটা ইয়ে আছে...

লক্ষী = মা, আমার কন‍্যাশ্রীর বালা দুটো খুঁজেই পাচ্ছি না! পিসি বারবার করে বলে দিয়েছে ও দুটো পরে আসতে। 

দুর্গা = থাক মা, ও দুটো আর পরে কাজ নেই। ওখানে ছিঁচকে চোর থেকে ডাকাত, তোলাবাজ থেকে গুন্ডা সবাই আছে।

লক্ষী = পিসি তো গুন্ডা কন্ট্রোল করে, তাহলে ভয় কিসের?

দুর্গা = সেটা যেমন ঠিক, তেমন তোর পিসি মিলেমিশে ভাগ করে খেতেও বলে।

কার্তিক = মা, আমি ভাবছি, ময়ূরে করে না গিয়ে এবারে সবুজ সাথীর সাইকেলে করে কার্নিভালে যাবো।

দুর্গা = ঐ তো সাইকেলের হাল! দেখিস মাঝপথে ভেঙে যায়!

গনেশ = (সিঙাড়া খেতে খেতে এসে ) মা আমি তাহলে দাদার ময়ূরে চড়ে যাবো?

দুর্গা = না বাবা গনশা, তোমার চাপে যদি ময়ূর মাঝপথে কেঁদে ফেলে তাহলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে! আর তুমি এভাবে সিঙাড়া খেতে খেতে বাইরে বেরিও না, সিবিআই ইডির চোখে একবার পড়লে আর রক্ষে থাকবে না!

মহিষাসুর = মা, আমি কি গতবারের মতন মুখ গামছা দিয়ে ঢেকে যাবো?

দুর্গা = ওটা ব‍্যাকডেটেড, পিসি কেসটা অনেকদিন আগেই শেষ করে দিয়েছে।

মহিষাসুর = তাহলে কি ফ্রেঞ্জকাট দাড়ি নিয়ে হাতে ক্রিকেট ব‍্যাট নিয়ে হাঁটবো?

দুর্গা = এটা যদিও টাকটা কেস, তবে আমার মনেহয় তুই একটা রঙিন জহরকোট পরে মাথায় একটা পাহাড়ি টুপি পরে নে। আর হ‍্যাঁ, হাঁটার সময় চোখ দুটো ছোট করে খুলবি।

কলা বৌ = মা, পিসি গতবছর বলেছিলো, পরেরবার বিএমডব্লিউ আর ভলবো করে কার্নিভালে নিয়ে যাবে। তা কই এবারে তো কিছু পাঠালো না!

দুর্গা = বলিহারি বৌমা তোমার আশা, যে বন‍্যা ত্রানে হেলিকপ্টার পাঠায় না, সে আমাদের জন্য ভলবো বিএমডব্লিউ পাঠাবে! খোলা ট্রাকে করে হাওয়া খেতে চলো।

( দুর্গার স্বপরিবারে কার্নিভালে প্রবেশ)

পিসি = আরে গৌরী, নীলসাদা শাড়িতে তোমাকে দারুণ লাগছে! গলায় উজ্জ্বল মুক্তোর হারটা দেখে মনে হচ্ছে ওটা ত্রিফলার গায়ে পেঁছিয়ে থাকা আলো। আমার তো দেখেই অটোমেটিক কবিতা পাচ্ছে..

(এই কথা শোনা মাত্রই সরস্বতী আর লক্ষী কানে হেডফোন গুঁজে দিয়েছে)

দুর্গা = দয়াকরে আমাকে গৌরী নামে ডাকবেন না। আসলে ঐ নামে ডাকলেই মনেহয় কেউ আমাকে এখুনি গূলি করবে।

পিসি = হ‍্যাঁরে গনশ, তোকে কতো করে বলেছি ডায়েট কন্ট্রোল কর। তোর মধ‍্যপ্রদেশ তো পাত্তোকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে। এই ভুড়ি নিয়ে ক‍্যাট ওয়ার্ক হয়! এবারে যাওয়ার সময় এক পেটি সিঙ্গুর সরিষার তেল নিয়ে যাবি। একেবারে কোলেস্টেরল ফ্রী। আর তোর বৌ-টা তো শুকিয়ে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে আহারে বাংলা বা ইলিশ উৎসবে নিয়ে এসে ভালোমন্দ খাওয়া। 

(কার্তিককে ডিএসএলআর-এ ছবি তুলতে দেখে পিসি রেগে গিয়ে)

পিসি = এই! এই কাতু! ওটা ব‍্যাগে ঢোকা আগে। চালাকি পায়া হ‍্যায়! কার্নিভালে এসে ম‍্যাথুর মতন স্টিং করতা হ‍্যায়!

কার্তিক = আরে না না! আমি ফেসবুকে দেব বলে ছবি তুলছি। 

পিসি = ওসব আমি নেহি জানতা হ‍্যায়! ক‍্যামেরা দেখলেই আমার স্নেহের ভাই গুলো ভয় পায়! আসলে, গোয়াল বার্নিং কাউ ফিয়ার সিঁদুরে ক্লাউড, আরকি!

(কার্তিক ক‍্যামেরা ব‍্যাগে ঢুকিয়ে আবার তীর ধনুক নিয়ে পোজ দিতে শুরু করলো)

পিসি = তুই কি রে কাতু! এখনো তীর ধনুকেই পড়ে আছিস! ওরে কেস্টা ওকে দু-চারটে পেটো অন্তত দে।

(লক্ষীর দিকে তাকিয়ে)
পিসি = তোকে কতোবার ফোন করে বিশ্ব ব‍্যাঙ্গ সম্মেলনে আসতে বললাম, তাও একবারও এলি না! আগে তো প্রায় সুদীপ কাকুর সাথে অ্যাম্বুলেন্সে চড়েও আসতিস! 

(সরস্বতী নোটপ্যাড নিয়ে ব‍্যস্ত। তার দিকে তাকিয়ে খানিকটা রেগে গিয়ে)

পিসি = যতই খুটুর পুটুর করো না কেন, ভুলে যেও না , ইন্টারনেট ব‍্যালেন্স আমার গরমেন্টই ভরে। 

মহিষাসুর = পিসি আমাদের ত্রিপাক্ষিক চুক্তিটার কি হলো?

পিসি = আমি তোর সাথে একটাও কথা বলবো না। আমাকে মা বোলতা হ‍্যায়। ওউর হামার বিরুদ্ধে চক্কান্ত করতা হ‍্যায়!

দুর্গা = পিসি এবারে অন্তত বিদায় দিন। আমার ভোলেবাবা হয়তো আমাকে ভুলেই গেছে..

পিসি = চিন্তা করিস না! যেতে দেরি হবে সেটা আমি হোয়াটস অ্যাপ করে দিয়েছি। আর হ‍্যাঁ, ভোলেবাবা যাতে একাএকা বোরিং না হয় তাই মদনাকে পাঠিয়ে দিয়েছি।

গান্ধী স্মরণে কালীপিসি

আজ গান্ধীজির জম্মোদিন। আমার সাথে ওনার জীবনের যথেষ্ট মিল আছে। দুজনকেই অনেক লড়াই করতে হয়েছে। অবশ‍্য আমাকে ওনার থেকে একটু বেশীই লড়তে হয়েছে। ওনার সময় তো বিটিশরা কুৎসা অপপোচার করতো না। আমাকে যেমন সবাই অগ্নিকন‍্যা বলে ডাকে, ঠিক তেমনই ওনাকে সবাই বাপুজি বলে ডাকতো। তোমরা যে এখন বাপুজি কেক খাও ঐ কেকের কারখানা উনিই করেছিলেন। আমি যেমন হাওয়াই চটি আর ছাপাশাড়ি পরে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াই উনিও তেমনই সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। ওনার সময়ে যদি মোবাইল থাকতো তাহলে উনিও একটা আইফোন কিনে অহিংসাই পরম ধম্মো লিখে, টুইট করতেন। ডান্ডি মার্চ ফেসবুক পেজ থেকে লাইভ করতেন। উনি সত‍্যাগ্রহে বিশ্বাসী ছিলেন, আর আমি সততার পোতীক। যদিও ইদানিং আমার তেরো হাত কাটআউট একটু কম জনপিয়। 

উনি আমার মতন আন্দোলন করার সময় মাঝেমধ্যেই অনশন করতেন। রবীন্দোনাথ একবার ফলের রস খাইয়ে অনশন ভাঙান, সেটা আগেই তোমাদেরকে বলেছি। আমি অবশ্য চকলেট খেয়েই অনশন করতাম। আমাকে যেমন সবাই কন‍্যাশ্রীর জননী বলে, ওনাকেও লোকে জাতীর জনক বলে। উনিও আমার মতন আইন নিয়ে পড়েছিলেন। আমাদের খোকাবাবু যেখানে চাঁদের পাহাড়ের সুটিং করেছিল সেই আফ্রিকায়। তবে ওনার কলেজের বাইরে সিপেম স্টেনগান নিয়ে অপেক্ষা করতো না। তবে ওনাকে আমার মতন সিঙ্গাপুর, লন্ডন, জার্মানি ঘুরে বিনিয়োগ আনার ঝামেলা পোয়াতে হয়নি। আমি যেমন গলায় 'আমরা সবাই চোর' লিখে মহানগর মার্চ করেছিলাম, সিঙ্গুরে সর্ষে চাষের দাবী নিয়ে আন্দোলন করেছিলাম। উনিও ঠিক তেমনই ডান্ডি মার্চ করেছিলেন। 

আমি যেমন ২০১১ আগে প্রায় প্রতি মাসেই দুচারটে বনধ ঢেকে, হাইওয়ে অবরোধ করে সরকারের সাথে অসহযোগিতা করেছিলাম, উনিও ঠিক তেমনই অসহযোগ আন্দোলন করেছিলেন বিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে। আমি যেমন ডেলোতে গোলটেবিল বৈঠক করছি, উনিও তেমনই বিটিশদের সাথে গোলটেবিল বৈঠক করেছিলেন। আমি যেমন ডাক দিয়েছি, সিপেম ভারত ছাড়ো। উনিও ইংরেজদের বিরুদ্ধে ভারত ছাড়ো আন্দোলন করেছেন। 

এই এই চোপ! চোপ! কেউ কথা বলবে না! তবে এতোকিছু মিল থাকার স্বত্ত্বেও বেশকিছু অমিলও আছে। উনি কিন্তু আমার মতন, কবিতা লিখতে, গান লিখতে, কোটি টাকার ছবি আঁকতে পারতেন না। উনি অহিংসায় বিশ্বাসী আর আমি, বদল নয় বদলা চাই। আমি ওনার থেকে অনেক বেশি রাফ এন্ড টাফ, গুন্ডা কন্টোল করি। চৌরিচৌরায় আগুন লাগলে উনি আন্দোলন থামিয়ে দেন আর আমি বিধানসভা ভাঙচুর করে আন্দোলন শুরু করি। 

হঠাৎ সামনে থেকে উঠে এক দামাল বলল- পিসি, এবারে আমরা বুঝেছি আপনার অনুপ্রেরণা না থাকলে উনি এতকিছু করতেই পারতেন না! পিসি মুচকি হেসে বলল, দুষ্টু। ওনার জন্মদিনে, আমার বড়দাও আজ ওনাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে ওনাকে স্মরণ করেছেন। যদিও কিছু লোকে কুৎসা করে, বড়দার বড়দা নাকি ওনাকে গুলি করেছিল। যাই হোক সেসব পুরোনো কথা ভুলে গিয়ে আমরা সবাই মোহনভগবত, সরি! সরি! মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে শোদ্ধার সাথে স্মরণ করি চলুন...
ইন্দোনীল একটা গান করে অনুষ্ঠান শেষ করো...

Tuesday, 19 September 2017

মহিষাসুরমর্দিনী

প্রতি বছরই মা কৈলাস থেকে ফ্লাইট ধরে দার্জিলিং-এ ল‍্যান্ড করেন। তারপর দার্জিলিং থেকে কোলকাতায়। এবছর দার্জিলিংয়ের আবহাওয়া ভালো নয়। আকাশ 'গুরুং, গুরুং' করছে। 'হড়কা' বানের সম্ভবনাও আছে। মা তো ক্ষেপে ব‍্যোম! সরাসরি গঙ্গাপাড়ের বাড়িতে ফোন, বলি পাহাড় এতো হাসলে আমি ল‍্যান্ড করবো কি করে? আর কতদিন লাগবে হাসি থামাতে? ওপার থেকে পিসি, না মানে ওরা কোন ট্র‍্যাকে খেলতে চাইছে সেটা ধরে ফেলেছি। আর মাত্র কয়েকটি দিন। দেবী রেগে গিয়ে, তোমরা কেমন খেলছো সেটা বাইচুং-কে দেখেই বুঝতে পারছি! লক্ষী বলল, মা এবারে তাহলে পাতলেবাসে যাওয়া হবেনা? দেবী গম্ভীরভাবে বললে, এবারে শুধু বাসেই যেতে হবে বোধহয়।

গনেশ এতক্ষণ খবর দেখছিল। সে হঠাৎ ছুটে এসে বলল, মা এবারে অন্ডালে ল‍্যান্ড করি চলো। ওখান থেকে 'বুলেটপ্রুফ' ট্রেনে কোলকাতায় যাওয়া যাবে। দেবী অবাক হয়ে বলল, বলিস কিরে গনশা! তোর পিসি বুলেটপ্রুফ ট্রেন চালু করে দিয়েছে! ভালো করে খোঁজ নিয়ে দ‍্যাখ ঢপ দেয়নি তো! হ‍্যাঁরে সর, তুই কিছু শুনেছিস? সরস্বতী ফেসবুক ঘাঁটতে ঘাঁটতে বলল, পিসি কন‍্যাশ্রীর পুরস্কার পাওয়ার প্রচার ছাড়া আর কিছু করছে বলে শুনিনি। অতপর দোনামোনা ক‍রে অন্ডালেই মা ল‍্যান্ড করলেন। তারপর বুলেটপ্রুফ ট্রেন না পেয়ে মা পুরো খচে ব‍্যোম! অনেক কষ্টে কার্তিক শান্ত করে। নারদ কাকুকে হোয়াটস অ্যাপ করতে, উনি ওলা নিয়ে হাজির হন। লং জার্নিতে এমনিতেই ক্লান্ত, খিদেও পেয়েছে তাই ল‍্যাঙচা আর শিঙাড়া কিনে নিয়ে ওলাতে চাপলো সবাই। ল‍্যাঙচাটা জঘন্য খেতে। তবে সিঙাড়াটা দারুণ। কার্তিক হেসে বলল, জানতাম এটা ভালো হবে। দোকানের ওপরে তো সুব্রত কাকুর হোল্ডিং ঝুলছে দেখেছি।

দীর্ঘ জার্নি শেষ করে অবশেষে তারা গঙ্গা পাড়ের বাড়িতে পৌঁছায়। বাড়ির নীচে নারদকে আটকে দিলো সিকিউরিটি। দেবী জিজ্ঞেস করাতে সিকিউরিটি বলল, ম‍্যাডামের নিষেধ আছে। যদি আবার স্টিং ফিং কিছু করে বসে। তারপর লিফ্টে করে চোদ্দ তলায় পৌঁছালেন দেবী। দেবী বললেন, এতো কড়া সিকিউরিটি! এতোগুলো কুকুর পাহারায়! কার্তিক বলল, আমাদের দেখে ঘেউঘেউ করেই চলেছে। পিসি হেসে বলল, নারে কাতু, তোদের দেখে নয়! ওরা ডিএ-র জন‍্য চ‍্যাঁচাচ্ছে। তারপর পিসি দেবীকে উদ‍্যেশ‍্য করে বললেন, এত লাগেজ নিয়ে একা একা কেউ আসে! নন্দী ভিঙ্গীকে সাথে করে আনতে পারতে তো! দেবী আক্ষেপের সুরে বললেন, নিয়ে আসবো তো ঠিকই ছিল, তারপর হঠাৎ কোথা থেকে খবর পেল যে অষ্টমী থেকে টানা পাঁচদিন জল বন্ধ। ব‍্যাস, আর আসতে চাইলো না। পিসি হেসে বললে, আরে ধুর, ওটা তো নামেই বন্ধ। আসলে যারা ব্ল‍্যাকে বেচে তাদেরকেও তো দেখতে হবে নাকি! ওরা আবার প্রচুর অনুদান দেয়। এরপর পিসি হাসি মুখে সবার খোঁজ নিতে লাগলো, তা সর, কন‍্যাশ্রীর টাকা পেয়েছ তো? লক্ষী মা, সবুজ সাথীর সাইকেল পেয়েছো? গনেশের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল, ওমা! ১৫০০ কেজির বাচ্চাটা কতো বড়ো হয়ে গেছে! ওমা, কাতুটাকে কি সুন্দর লাগছে! তুই বাংলা সিনেমা কর। আরে চিন্তা করিসনা, আমি ছবি ট‍্যাক্স ফ্রি করিয়ে দেব।

আরও এটা সেটা কথার পর দেবী বললেন, তা এবারে কোন অসুরটাকে মারবো? বয়স হয়েছে আমার তাই বেশি ছোটাছুটি করতে পারবো না। একটা ভালো দেখে অসুর বেছে দাও, আমি তার ফোনে ব্লু হোয়েল ইনস্টল করে দেব ব‍্যাস। পিসি বললেন, এবারে আর কাউকে মেরোনা! এমনিতেই সিবিআইয়ের চাপে বড়ো বড়ো অসুরগুলো সব আধমরা হয়ে আছে। চাপ সবাই নিতে পারছে না। দেবী বললেন, সেকি! অসুর না মেরেই ফিরে যাবো! সেটা কি করে হয়! এত খরচা করে স্বপরিবারে এলাম! পিসি বলল, তাতে কি হয়েছে! আমিও তো দলবল নিয়ে সিঙ্গাপুর, লন্ডন, জার্মানি ঘুরি। আমি কি বিনিয়োগ আনি নাকি!

দেবী বলল, অসুর যখন মারা হবে না তাহলে এবছর দশমীর দিন সকালেই ফ্লাইট ধরে ফিরবো। পিসি হেসে বলল, আসা পঞ্জিকা মতে, কিন্তু যাওয়া আমার ইচ্ছায়। রেড রোডে ফ‍্যামিলি প‍্যারেড না করেই চলে যাবে, ওটি হচ্ছে না। দেবী অবাক হয়ে বলল, মানে! আমাকে আরও দুদিন থাকতে হবে! কার্তিক খুব খুশি। আচ্ছা পিসি, এবারের কার্নিভালটা ব্রাজিলিয়ান স্টাইলে করলে হয়না! ইওয় ভয়েস উইথ বেঙ্গা বয়েস! পিসি হেসে বলল, দুষ্টু...